দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতে নতুন একটি অর্জনের স্বাক্ষর রাখল ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি)। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষণা মূল্যায়ন সূচক ‘নেচার ইনডেক্স’-এর সর্বশেষ প্রাতিষ্ঠানিক র্যাঙ্কিংয়ে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থান অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই নয়, দেশের সব ধরনের গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকায়ও আইইউবি উঠে এসেছে পঞ্চম স্থানে। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে তাদের অবস্থান তৃতীয়।
বিশ্বব্যাপী গবেষণার মান ও প্রভাব মূল্যায়নে নেচার ইনডেক্সকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বের শীর্ষ বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধের ভিত্তিতে এই র্যাঙ্কিং তৈরি করা হয়। ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকাশিত গবেষণাকর্মের তথ্য বিশ্লেষণ করে এবারের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
সর্বশেষ মূল্যায়নে আইইউবির নেচার ইনডেক্স শেয়ার স্কোর দাঁড়িয়েছে ০.৬৩। মোট চারটি গবেষণা প্রবন্ধের অবদানের ভিত্তিতে এই অবস্থান অর্জন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় প্রতিষ্ঠানটির সাফল্য সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে। ফিজিক্যাল সায়েন্সেস বা পদার্থবিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আইইউবি প্রথম স্থান দখল করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির সেন্টার ফর কম্পিউটেশনাল অ্যান্ড ডেটা সায়েন্সেসের কম্পিউটেশনাল ফিজিকস শাখার পরিচালক এবং ফিজিক্যাল সায়েন্সেস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জুয়েল কুমার ঘোষের দুটি গবেষণা প্রবন্ধ এবারের র্যাঙ্কিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। গবেষণাগুলো আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের জটিল বিষয় নিয়ে পরিচালিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রবন্ধ দুটি প্রকাশিত হয়েছে ইউরোপিয়ান ফিজিক্যাল জার্নাল সি এবং জার্নাল অব হাই এনার্জি ফিজিকসের মতো মর্যাদাপূর্ণ সাময়িকীতে।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি, স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকসের সহযোগী সদস্য আনোয়ার জামান সজীবের একটি গবেষণা প্রবন্ধও এই মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মহাকাশ গবেষণায় ব্যবহৃত অত্যাধুনিক যন্ত্রের কার্যকারিতা ও পরিমাপের নির্ভুলতা নিয়ে পরিচালিত ওই গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে। প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস সাময়িকীতে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টার ফল হিসেবে এই সাফল্য এসেছে। গত কয়েক বছরে গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ গবেষক তৈরি এবং বৈশ্বিক গবেষণা নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সেই ধারাবাহিক প্রচেষ্টারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে।
আইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য শুধু অর্থায়ন নয়, প্রয়োজন অনুসন্ধানভিত্তিক একাডেমিক পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। বিশ্ববিদ্যালয়টি ধারাবাহিকভাবে সেই পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছে। তার মতে, এই স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠানের গবেষণা সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক মানের গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রচেষ্টার স্বীকৃতি।
সহ-উপাচার্য অধ্যাপক ড্যানিয়েল ডব্লিউ লুন্ড বলেন, নেচার ইনডেক্সের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, কারণ এটি শুধুমাত্র আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শীর্ষ বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাকে মূল্যায়ন করে। ফলে এই র্যাঙ্কিংয়ে ভালো অবস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান, গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতার একটি শক্তিশালী সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক গবেষণা সূচকে পিছিয়ে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবেষণার পরিমাণ ও মান উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আইইউবির এই অর্জন দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকাশনা বাড়ানোর ক্ষেত্রে অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও উৎসাহিত করবে।
২০১৪ সালে চালু হওয়া নেচার ইনডেক্স বর্তমানে বিশ্বব্যাপী গবেষণা মূল্যায়নের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত। নেচার, সায়েন্স, নেচার ফিজিকস, দ্য ল্যানসেট, সেল, জার্নাল অব হাই এনার্জি ফিজিকস এবং অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকসের মতো আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ এই সূচকের মূল্যায়নে বিবেচিত হয়। ফলে এই তালিকায় স্থান পাওয়া যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আন্তর্জাতিক গবেষণা অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হয়।

