ভারতের বহুল আলোচিত মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ঘিরে আবারও দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত মাসে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পর এবার পুনঃপরীক্ষাকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা এর আগে দেশটির কোনো বড় ভর্তি পরীক্ষায় দেখা যায়নি।
আগামী ২১ জুন অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পুনঃপরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিরাপদে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দিতে প্রথমবারের মতো ভারতীয় বিমানবাহিনীর সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রশ্নপত্র পরিবহনের দায়িত্বে থাকবে বিমানবাহিনীর বিমান। এর মাধ্যমে পরিবহনের সময় প্রশ্নপত্রে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ, কারচুপি কিংবা ফাঁসের সম্ভাবনা কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতেই এই বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানও জানিয়েছেন, পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন এবং নিরাপত্তা জোরদার করাই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য।
গত ৩ মে অনুষ্ঠিত মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে বাতিল হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বিভিন্ন মহল থেকে পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পুনঃপরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেই সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেয়।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় পাঁচ লাখ নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হবে। পরীক্ষাকেন্দ্র, প্রশ্নপত্র সংরক্ষণাগার, পরিবহন ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকবে। শুধু মানবীয় নিরাপত্তাই নয়, প্রযুক্তিকেও যুক্ত করা হয়েছে এই ব্যবস্থায়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। এসব ক্যামেরা সন্দেহজনক আচরণ শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ নজরদারি চালানো হবে, যাতে পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের গুজব, প্রশ্নফাঁস বা অবৈধ কার্যক্রম দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
প্রশ্নপত্র তৈরির প্রক্রিয়াতেও আনা হয়েছে কঠোর নিয়ন্ত্রণ। প্রায় তিন সপ্তাহ আগে গঠিত শিক্ষক ও বিষয়বিশেষজ্ঞদের একটি দল বর্তমানে প্রশ্নপত্র প্রণয়নের কাজ করছে। তবে তাদেরকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন পরিবেশে রাখা হয়েছে। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট কিংবা বাইরের কোনো যোগাযোগ ব্যবহারের সুযোগ তাদের নেই।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ বহাল থাকবে। অর্থাৎ ২১ জুন পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রশ্নপত্র প্রস্তুতকারী দলের সদস্যরা কার্যত একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশেই অবস্থান করবেন। এর লক্ষ্য একটাই—প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা শতভাগ নিশ্চিত করা।
ভারতের সবচেয়ে বড় ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ ভর্তি পরীক্ষাগুলোর একটি এই মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী এতে অংশ নেয়। তাই প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনা শুধু একটি পরীক্ষা নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকেই নড়বড়ে করে দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বিমানবাহিনীর মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পরিবহন, বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারির মতো পদক্ষেপগুলো শুধু নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নয়; বরং হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনারও একটি বড় প্রচেষ্টা। এখন দেখার বিষয়, এত কঠোর ব্যবস্থার পর পুনঃপরীক্ষা কতটা সুষ্ঠু ও বিতর্কমুক্তভাবে সম্পন্ন করা যায়।
সিভি/এইচএম

