দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেওয়া এবং পরীক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে সম্বোধনের অভিযোগের প্রতিবাদে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড়ে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছেন একদল শিক্ষার্থী।
তাদের দাবি, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ নিশ্চিত করতে হবে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা সায়েন্সল্যাব মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা সড়ক অবরোধ করলে ওই এলাকায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে আশপাশের সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ‘এক দফা, এক দাবি—মিলনের পদত্যাগ’ এবং ‘আমি কে, তুমি কে—ফার্মের মুরগি, ফার্মের মুরগি’ স্লোগান দিতে দেখা যায়।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত পরীক্ষার্থীদের জন্য বড় ধরনের দুর্ভোগ তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি পরীক্ষার্থীদের নিয়ে করা বিতর্কিত মন্তব্য তাদের ক্ষুব্ধ করেছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদেই তারা সড়কে নেমেছেন বলে জানান।
এদিকে একই দাবিতে রাজধানীর শাহবাগ, উত্তরা ও মিরপুরে পৃথক বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন পরীক্ষার্থীরা। পাশাপাশি রাজশাহী, বরিশাল, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সামনেও অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এমন স্লোগানের কারণ কী?
ফাঁস হওয়া এই ফোনালাপের অডিও এবং বিস্তারিত কথোপকথনটি বিশ্লেষণ করলে শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ এবং রাজপথে ‘ফার্মের মুরগি’ স্লোগান দিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করার প্রকৃত কারণটি একদম দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই আলাপচারিতা থেকে যে মূল বিষয়গুলো বেরিয়ে এসেছে, তা নিচে ৩টি প্যারায় বিশ্লেষণ করা হলো:
দ্বিমুখী অবস্থান ও ‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্যের অসংবেদনশীলতা: ফোনালাপে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন নিজেকে পরীক্ষা স্থগিতের পক্ষের লোক দাবি করলেও, মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি পরীক্ষার্থীদের অত্যন্ত আপত্তিকরভাবে ‘ফার্মের মুরগি’ হিসেবে সম্বোধন করেন। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, মিটিংয়ে শিক্ষার্থীদের শারীরিক নাজুকতা বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, “এগুলো তো ফার্মের মুরগি। একটু ভিজলেই জ্বর চলে আসে।”
একজন অভিভাবক যখন সন্তানের স্বাস্থ্য ও পরীক্ষা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় ভুগছেন, তখন দেশের শিক্ষামন্ত্রীর মুখে শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’র মতো তুচ্ছ ও অবমাননাকর শব্দে তুলনা করাটা শিক্ষার্থীদের আত্মসম্মানে চরম আঘাত হেনেছে। সোমবার রাতে এই ভিডিওটি ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে যে, পর্দার আড়ালে নীতিনির্ধারকেরা তাদের বাস্তব কষ্টকে কতটা তাচ্ছিল্য ও উপহাসের চোখে দেখেন।
মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও নীতিগত সিদ্ধান্তের চরম বৈসাদৃশ্য: কথোপকথনে সিটি কলেজের ওই ছাত্রী যখন বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন যে, ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র ও আইসিটি পরীক্ষার দিনগুলোতে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ভিজে অলরেডি অনেক শিক্ষার্থীর জ্বর চলে এসেছে, তখন মন্ত্রীর উত্তর ছিল চরম উদাসীন। তিনি দায় এড়াতে আবহাওয়া অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসকদের রিপোর্টের দোহাই দেন এবং বলেন, “মিটিংয়ে কেউ পরীক্ষা পেছানোর জন্য রাজি হয় না।”
অথচ বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন—রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়া এবং তীব্র জলাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছিল। পড়াশোনা ও পরীক্ষার কঠিন সিলেবাসের চাপের মধ্যে থাকা শিক্ষার্থীদের এমন বাস্তব ও মানবিক সংকটকে নীতিনির্ধারকেরা যখন স্রেফ টেবিল-চেয়ারের সিদ্ধান্ত দিয়ে উড়িয়ে দেন, তখন শিক্ষার্থীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়।
‘কফি খাওয়ার’ পরামর্শ বনাম রাজপথের ক্ষোভ: ফোনালাপের শেষ দিকে রুটিন ও সিলেবাস নিয়ে শিক্ষার্থীর যৌক্তিক আকুতির জবাবে শিক্ষামন্ত্রী কোনো কার্যকর সমাধান না দিয়ে সান্ত্বনার সুরে বলেন, “এখন গরম এক কাপ কফি দিতে বলো, খেয়ে পড়তে বসে যাও।”
দুর্যোগের দিনে পরীক্ষার হলে যাওয়ার চরম ভোগান্তি আর পরীক্ষা ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব না দিয়ে এমন হালকা ও খামখেয়ালীপূর্ণ পরামর্শ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে আরও উস্কে দেয়। এরই প্রতিক্রিয়ায় পরদিন মঙ্গলবার সকালে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং সায়েন্সল্যাব ও উত্তরায় রাজপথ অবরোধ করে।
তারা শিক্ষামন্ত্রীর সেই ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যকেই নিজেদের প্রতিবাদের অস্ত্র বানিয়ে স্লোগান ধরে—‘তুমি কে, আমি কে—ফার্মের মুরগি’। এর মাধ্যমে তারা বুঝিয়ে দেয়, কফি খেয়ে ঘরে বসে থাকার ‘ফার্মের মুরগি’ তারা নয়; বরং অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে নামা লড়াকু ছাত্রসমাজ।

