সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালের একটি ফেসবুক রিল ভিডিও ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ধারণ করা ওই ভিডিওতে তাকে গানের সঙ্গে নাচতে দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে কেউ ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পক্ষে মত দিচ্ছেন, আবার কেউ বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশে এমন ভিডিও তৈরি করা একজন শিক্ষকের জন্য কতটা উপযুক্ত, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ঘটনাটি নিয়ে শিক্ষা প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এর মধ্যেই দেশের বিভিন্ন এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকাদের একাংশ বিউটি রাণী পালের প্রতি সংহতি জানিয়ে একই গান ব্যবহার করে নিজেদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে রিল প্রকাশ করছেন।
এই পরিস্থিতিতে সামনে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন—সরকারি চাকরিতে থাকা কোনো শিক্ষক কি ব্যক্তিগত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন? বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এমন ভিডিও তৈরি করলে তা কি চাকরিবিধি লঙ্ঘনের মধ্যে পড়ে?
সরকারি চাকরিবিধিতে কী বলা আছে?
সরকারি কর্মচারীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯। এই বিধিমালায় সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্বশীল আচরণ, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং চাকরির মর্যাদা রক্ষার বিষয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে এই বিধিমালায় সরাসরি এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গান, নাচ বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে পারবেন না।
অর্থাৎ কোনো ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে বলেই সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাকরিবিধি লঙ্ঘন বলা যায় না। বিষয়টি নির্ভর করবে ভিডিওর ধরন, স্থান, সময় এবং এর মাধ্যমে সরকারি দায়িত্ব বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না—এসব বিষয়ের ওপর। প্রশাসনিকভাবে সাধারণত কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। যেমন—
- ভিডিওটি অফিস চলাকালীন সময়ে ধারণ করা হয়েছিল কি না;
- ভিডিও তৈরির কারণে পাঠদান বা বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে কি না;
- সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ বা সম্পদের অপব্যবহার হয়েছে কি না;
- ওই আচরণ একজন সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব ও মর্যাদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্য রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা, ২০১৯। এই নির্দেশিকায় সরকারি কর্মীদের অনলাইনে দায়িত্বশীল আচরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এমন কোনো তথ্য, বক্তব্য বা কনটেন্ট প্রকাশ করা যাবে না, যা সরকারি প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে।
এছাড়া বিভ্রান্তিকর, আপত্তিকর বা শৃঙ্খলাবিরোধী বিষয় প্রকাশের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার নির্দেশনা রয়েছে। তবে এই নির্দেশিকাতেও ব্যক্তিগত গান, নাচ বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভিডিও প্রকাশকে আলাদাভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি। কোনো বিষয় বিধিমালা ভঙ্গ করেছে কি না, সেটি নির্ধারণ করতে ঘটনার সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হয়।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে কী ব্যবস্থা হতে পারে?
যদি তদন্তে কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি বা সরকারি নির্দেশনা অমান্যের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অসদাচরণ প্রমাণিত হলে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- তিরস্কার;
- পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধিতে বাধা;
- আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায়;
- নিম্ন পদ বা নিম্ন বেতন স্কেলে অবনমন;
- বাধ্যতামূলক অবসর;
- চাকরি থেকে অপসারণ;
- বরখাস্ত।
তবে কোনো ঘটনায় কোন ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে অভিযোগের ধরন, তদন্তের ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) সাবেক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান মনে করেন, একজন শিক্ষক সংস্কৃতিমনা হওয়া ইতিবাচক বিষয়। তিনি বলেন, শিশুদের শেখানোর ক্ষেত্রে গান, নাচ ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আনন্দের মাধ্যমে শেখানোর ধারণায় শিক্ষকরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারেন। তার মতে, কোনো বিষয়কে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে এর প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খাইরুন নাহার লিপিও বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিশুদের আনন্দময় পরিবেশে শিক্ষা দিতে গান, নাচ, গল্প বলা ও বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে অংশ নেন। তিনি মনে করেন, কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অশালীন না হলে এবং তা যদি দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি না করে, তাহলে সেটিকে নেতিবাচকভাবে দেখা উচিত নয়। তার ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভিডিও প্রকাশের কারণে একজন শিক্ষককে হয়রানি করা বা শিক্ষকদের সৃজনশীল কাজে নিরুৎসাহিত করা ঠিক হবে না।
বিউটি রাণী পালের রিল ভিডিও নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক মূলত সরকারি চাকরির দায়িত্ব, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মধ্যকার ভারসাম্যের প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন সরকারি কর্মচারীর ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা থাকলেও তাকে একই সঙ্গে নিজের পেশাগত মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়। এখন তদন্তের ফলাফলই নির্ধারণ করবে, ওই ভিডিও সরকারি আচরণবিধির কোনো ধারা লঙ্ঘন করেছে কি না।

