দলীয় আশীর্বাদে নিয়োগ পেয়ে উপাচার্যরা এখন নিজেদের দাপ্তরিক প্যাডকে রাজনৈতিক তোষামোদের হাতিয়ার বানিয়েছেন। পুরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক আনুগত্যের বন্দি বানিয়ে তারা কি বিশ্ববিদ্যালয়কে চরম ওজনশূন্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন না?
কিছুদিন আগে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে চারজন সদস্য যুক্ত হয়েছেন। এই সদস্যদের ‘অভিনন্দন’ জানিয়েছেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নাজমুস সাদাত। স্থায়ী কমিটির প্রত্যেক সদস্যকে আলাদা আলাদাভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব দাপ্তরিক প্যাডে এই শিক্ষক লিখেছেন: “বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটির’ সদস্য হিসেবে আপনার অন্তর্ভুক্তির সংবাদ জেনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি। আপনার এই সফলতায় গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আমার নিজের পক্ষ থেকে আপনাকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।”
এই ‘অভিনন্দন বার্তাটি’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে শেয়ার করে সদ্য বিদায়ী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ খান লিখেছেন: “একজন ভাইস চ্যান্সেলর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের এবং তার নিজের পক্ষ থেকে একটি দলের নবনিযুক্ত স্থায়ী কমিটির সদস্যদের অফিসিয়ালি কি শুভেচ্ছা পাঠাতে পারেন? এর আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক উপাচার্য অফিসিয়ালি একজন মন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। উপাচার্য নামের এই সব দলীয় কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্রহানি করছেন। তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।”
প্রথমে ভেবেছিলাম, সম্ভবত অধ্যাপক নাজমুস সাদাতই প্রথম কোনো উপাচার্য হবেন, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান হয়ে, দাপ্তরিক প্যাডে একটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের এইভাবে প্রকাশ্যে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখলাম, এই উপাচার্যেরও আগে প্রায় একই ধরনের শব্দ ও বাক্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক প্যাডে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যকে অভিনন্দন জানিয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক রেজাউল করিম। সম্ভবত এই দুইজনের কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে একই ধরনের বাক্যে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোজাম্মেল হক।
এখানেই মৌলিক প্রশ্নটি তৈরি হয়: যখন একজন উপাচার্য তার প্রাতিষ্ঠানিক প্যাডে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতাদের অভিনন্দন জানান, তখন তিনি প্রকৃতপক্ষে কার প্রতিনিধিত্ব করছেন? এ কথা তো অনস্বীকার্য যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও শত শত শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন ভিন্ন। তাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসী, কেউ হয়তো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্তই নন। এই বাস্তবতায় একজন উপাচার্য কীভাবে সবার নামে একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করতে পারেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা নিশ্চয়ই অস্বাভাবিক হবে না। নিয়োগপ্রাপ্ত এইসব উপাচার্যদের বাইরে কি আওয়ামী লীগ বা জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কোনো শিক্ষক সত্যি এই ধরনের অভিনন্দন-বার্তার পক্ষে সমর্থন জানাবেন? যদি উত্তর নেতিবাচক হয়, তাহলে বোঝা যায় যে এই বার্তাগুলো প্রকৃতপক্ষে প্রাতিষ্ঠানিক ঐকমত্যের প্রতিফলন নয়, বরং ব্যক্তিবিশেষের রাজনৈতিক অবস্থানের ফসল—যা জোর করে প্রতিষ্ঠানের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দলের প্রতি পছন্দ-অপছন্দের বিষয় থাকতেই পারে, যা মোটেও দোষের কিছু নয়; বরং সেটি গণতান্ত্রিক সমাজে তার অধিকারও বটে। তবে সেটি যখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নিরপেক্ষতার দায়ে থাকা প্রতিষ্ঠানকে জড়িয়ে ফেলে ‘পক্ষপাতমূলক’ অবস্থান নেয়, সমস্যাটি তখনই গাঢ় হয়। ব্যক্তিগত সামাজিক মাধ্যমে যদি কোনো শিক্ষক কাউকে অভিনন্দন জানান, সেটি একরকম; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক প্যাডে, উপাচার্য পরিচয়ে, ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারীর পক্ষ থেকে’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করে একই কাজ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এর মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা নীতিগতভাবে চূড়ান্ত আপত্তিকর।
আমাদের মনে রাখতে হবে, উপাচার্য পদটি কোনো রাজনৈতিক দলের ‘পদ-পদবি’ নয় যে সহযোদ্ধার ভালো খবরে এইভাবে অভিনন্দন বার্তা দেব। বরং এমন পদে আসীনের পর তার সবার প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি দেখানো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা রক্ষা করা সবচেয়ে বড় দায় হয়ে ওঠে।
এইসব মৌলিক প্রশ্ন তুললাম এই কারণে যে, আমাদের উচ্চশিক্ষালয়গুলো ঠিক কোন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে তা বুঝবার জন্য। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যখন নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তিনি কখনোই কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি এইভাবে আনুগত্য প্রকাশ করতে পারেন না। এটি নৈতিকতাবিরোধীই নয়, দৃষ্টিকটুও বটে।
একজন উপাচার্যের মর্যাদা আর ওই স্থায়ী কমিটির সদস্যের মর্যাদা এক নয়, তা আমাদের এই শিক্ষকরা জানেন কি? তারা (উপাচার্যরা) যে পদটিতে বসে আছেন, তার নিয়োগকর্তা হচ্ছেন আচার্য বা রাষ্ট্রপতি। এমন সম্মানীয় পদে আসীন থেকে, একটি রাজনৈতিক দলের সদস্যদের শুভেচ্ছা জানাতে তারা সম্বোধন করছেন, ‘শ্রদ্ধেয় মহোদয়’—কী অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গি তাদের! যে নিয়োগ একটি সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়, যার লক্ষ্য থাকে শিক্ষা প্রশাসনকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে পরিচালনা করা, অথচ এই পদে বসে থাকা একজন ব্যক্তি যখন প্রকাশ্যে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি এমনভাবে আনুগত্য প্রকাশ করেন, তখন তা কেবল সেই ব্যক্তির নৈতিক অবস্থানের প্রশ্ন নয়, বরং পুরো প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও বটে। যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এই উপাচার্যরা কি ভবিষ্যতে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে রদবদল হলে একইভাবে প্রাতিষ্ঠানিক প্যাডে শুভেচ্ছা জানাবেন? নাকি এই আনুগত্য কেবল একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতিই সীমাবদ্ধ?
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ নেই। ফলে শিক্ষকদের পছন্দের রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এমন শুভেচ্ছা জানানো যেতে পারত। কিন্তু না, সেটিকে ছাপিয়ে উপাচার্যদের এমন অবস্থান আমাদের সত্যিই ব্যথিত করে।
হ্যাঁ, এই কথা সত্য—উপাচার্য নিয়োগের প্রকৃত শর্ত ও স্বাধীন নিরপেক্ষ বিধি অনুযায়ী নিয়োগ পেলে তারা হয়তো এই পদে আসীন হতে পারতেন না। মূলত রাজনৈতিক দলের আশীর্বাদপুষ্ট হয়েই উপাচার্যদের নিয়োগ হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও আমরা দেখেছি, দলের আনুগত্য স্বীকার করা শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে এসেছে। বিএনপি সরকারও ঠিক একই পথ অনুসরণ করে সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের আদর্শ ধারণকারীদের এইসব পদে বসিয়েছে। ফলে আজকের এই ‘নান্দনিক’ অভিনন্দন বার্তা তারই ফসল বটে।
কিন্তু সবচেয়ে বাজে বিষয়টি হলো, এই উপাচার্যরা প্রায় একই ভাষায় এই ধরনের অভিনন্দন-বার্তা প্রদান করেছেন। মানে, তাদের এই অভিনন্দন বার্তাটি ‘কুম্ভীলকবৃত্তি’ শিকার! তাহলে এখানে সহজে প্রশ্ন উঠবে, এইসব অভিনন্দন বার্তাগুলো কি আসলে কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছিল, নাকি একজনের দেখাদেখি ট্রেন্ড হিসেবে অন্যরাও একই পথে হেঁটেছেন?
এই ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে—উপাচার্য পদটি যতটা না একাডেমিক যোগ্যতার হওয়া উচিত, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সেই ব্যক্তিটির আদর্শিক গভীরতা কতটুকু।
বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা। যখন এই প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে থাকা ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা জাহির করেন, তখন তা শিক্ষার্থীদের কাছে একটি ভুল বার্তা দেয়।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে আসীন কাউকে শুভেচ্ছা কিংবা অভিনন্দন জানানো আর রাজনৈতিক দলের নেতাদের অভিনন্দন জানানো এক নয়—সেটা এই উপাচার্যদের জানতে হবে। এই পদগুলো থেকে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুষ্ঠানিক আনুগত্য প্রকাশ কেবল নৈতিকতাবিরোধীই নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিও একটি বড় ধরনের আঘাত। উপাচার্যরা যদি নিজেদের ওজনশূন্যতায় ভোগেন, তাহলে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থাও ওজনশূন্য হতে বাধ্য। সরকার কি পারবে এইসব উপাচার্যদের তৈলমর্দন ঠেকাতে?
লেখক: ড. নাদিম মাহমুদ- গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়

