উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো গবেষণা। বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু শিক্ষার্থী তৈরি করলেই হয় না; নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, জননীতি প্রণয়ন, শিল্পের উদ্ভাবন এবং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা এখনো প্রয়োজনীয় গুরুত্ব ও স্বীকৃতি পায় না। সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে গবেষণার মানের কারণে নয়, বরং এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন ওঠায়।
সাম্প্রতিক এক জাতীয় দৈনিকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের গবেষণা অনিয়মের কারণে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসব অনিয়মের মধ্যে রয়েছে চৌর্যবৃত্তি, গবেষণার তথ্য বিকৃতি, ভুয়া তথ্য তৈরি এবং গবেষণাপত্র যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় কারসাজির মতো অভিযোগ।
সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরাই এই তালিকায় রয়েছেন। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ৪৪টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে, এরপর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ৪২টি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩২টি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ২১টি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০টি গবেষণাপত্র রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষকরাও এ তালিকায় আছেন। এত বিস্তৃত পরিসরের প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসা শুধু অনিয়মের মাত্রাই নয়, বরং এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সুযোগ করে দেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
বাংলাদেশ এমনিতেই গবেষণায় বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর কাতারে নেই। বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণার পরিমাণ ও প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম। কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংস এবং ওয়েবমেট্রিক্স র্যাংকিং অব ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজের মতো আন্তর্জাতিক সূচকগুলোতেও গবেষণার কর্মদক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোনো বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ই এসব র্যাংকিংয়ের বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জায়গা করে নিতে পারেনি। এটি নিছক কাকতালীয় নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা শুধু কতজন শিক্ষার্থী স্নাতক করেছে, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই প্রতিষ্ঠান কতটা নতুন ও গ্রহণযোগ্য জ্ঞান তৈরি করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি শক্তিশালী গবেষণা সংস্কৃতির ভিত্তি তৈরি হয় শ্রেণিকক্ষ থেকেই। শিক্ষার্থীদের শুরু থেকেই যুক্তিভিত্তিক চিন্তা, তথ্য বিশ্লেষণ, সাহিত্য পর্যালোচনা এবং একাডেমিক লেখালেখির মৌলিক দক্ষতা শেখানো প্রয়োজন। এর মাধ্যমেই তারা পরবর্তী সময়ে গবেষণা ও থিসিসের জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে তাত্ত্বিক শিক্ষা ও পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে স্বাধীনভাবে চিন্তা করা, গবেষণার পদ্ধতি বোঝা এবং বিশ্লেষণী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত থাকে।
পরবর্তী সময়ে এই শিক্ষার্থীদের একটি অংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক হন। ফলে শিক্ষাজীবনের সেই দুর্বলতা অনেক সময় তাদের পেশাগত জীবনেও থেকে যায়। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য গবেষণাপত্র প্রকাশের বাধ্যবাধকতা থাকায় অনেকে গবেষণার মানের চেয়ে প্রকাশনার সংখ্যা বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েন। অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কতটি গবেষণাপত্র প্রকাশ হয়েছে, সেটিই বড় বিবেচনা হয়ে দাঁড়ায়। গবেষণাপত্র কোথায় প্রকাশিত হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সাময়িকীর মান কেমন কিংবা গবেষণাটি কতটা কঠোরভাবে যাচাই করা হয়েছে—এসব বিষয় তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়।
ফলে স্বীকৃত ও কঠোর যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মানের একটি গবেষণাপত্রের সঙ্গে অখ্যাত কোনো স্থানীয় সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের মূল্যায়নে খুব বেশি পার্থক্য থাকে না—এমন অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে মৌলিক ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার বদলে দ্রুত একাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করাই অনেকের কাছে বেশি লাভজনক হয়ে উঠতে পারে। গবেষণার উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে তৈরি ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে শুধু প্রকাশনার সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের গবেষণা অঙ্গন অনিয়মে পরিপূর্ণ। সীমিত অর্থ, অবকাঠামোগত সংকট ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও অনেক বাংলাদেশি শিক্ষক ও গবেষক গুরুত্বপূর্ণ ও মানসম্পন্ন কাজ করে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাদের কাজ প্রমাণ করে, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সৎ ও গ্রহণযোগ্য গবেষণা সম্ভব। কিন্তু কিছু গবেষকের অনিয়ম পুরো দেশের গবেষণা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক প্রকাশক ও গবেষণা অংশীদাররা বাংলাদেশের গবেষকদের ব্যাপারে আরও সতর্ক হয়ে উঠতে পারেন। একই সঙ্গে সৎভাবে কাজ করা তরুণ গবেষকরাও অসাধু উপায়ে এগিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় পড়েন।
গবেষণায় অনিয়ম অবশ্য শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও চৌর্যবৃত্তি, তথ্য জালিয়াতি ও অন্যান্য ধরনের একাডেমিক অসদাচরণ ঘটে। পার্থক্য তৈরি হয় অনিয়মের পর প্রতিষ্ঠান কীভাবে ব্যবস্থা নেয়, তার ওপর। কার্যকর গবেষণা ব্যবস্থায় অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করা হয়, নিরপেক্ষ তদন্ত করা হয় এবং অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী এমন শাস্তি দেওয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে অন্যরা নিরুৎসাহিত হয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এসব প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল। অনিয়ম শনাক্ত করার দায়িত্ব প্রায়ই বাইরের প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে, তদন্ত শুরু হয় দেরিতে এবং গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রেও শাস্তি অনেক সময় সতর্কবার্তা বা লিখিত তিরস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
এই দুর্বলতার একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ভূমিকার সঙ্গেও যুক্ত। উচ্চশিক্ষা খাতের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি অনেক সময় একাডেমিক মান নিশ্চিত করার প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বাজেট বণ্টনকারী সংস্থা হিসেবে বেশি সক্রিয়—এমন সমালোচনা রয়েছে। গবেষণার জন্য প্রতিযোগিতামূলক অনুদান ব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। অথচ একটি কার্যকর গবেষণা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকদের স্বচ্ছ প্রস্তাবের ভিত্তিতে গবেষণা তহবিলের জন্য প্রতিযোগিতা করা উচিত। স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রস্তাব যাচাই করে গবেষণার সম্ভাব্য গুরুত্ব, মান ও সামাজিক প্রভাবের ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের নিজস্ব সমস্যাগুলো সমাধানেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, জনস্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, শিল্পোন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রে দেশের বাস্তবতা বোঝার জন্য নিজস্ব গবেষণা প্রয়োজন। কিন্তু গবেষণা যখন অনিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, তখন নিজেদের সমস্যা বোঝার জন্যও বিদেশি গবেষণার ওপর নির্ভরতা বাড়ে।
জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাইলে এই পরিস্থিতি বদলাতেই হবে। গবেষণাপত্রের সংখ্যা নয়, গবেষণার মানকে মূল্যায়নের কেন্দ্রে আনতে হবে। চৌর্যবৃত্তি ও তথ্য জালিয়াতির বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গবেষণার জন্য স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক অর্থায়ন, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং স্বাধীন পর্যালোচনার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় যদি নতুন জ্ঞান তৈরির জায়গা না হয়ে শুধু সনদ দেওয়ার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, তাহলে দেশের জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নও দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত হবে।

