বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে অনেকেই স্বাধীনতা, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ গড়ার সময় হিসেবে দেখেন। কিন্তু অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এই সময়টি একই সঙ্গে হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক চাপ, অনিশ্চয়তা এবং মানসিক উদ্বেগের সময়।
অর্থের সংকট শুধু পরবর্তী মাসের খরচ কীভাবে চলবে—এই চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে একজন শিক্ষার্থীর খাবার, পড়াশোনা, যাতায়াত, মানসিক অবস্থা এবং একাডেমিক ফলাফলের ওপর।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের চারটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০০ জন স্নাতক শিক্ষার্থীকে নিয়ে পরিচালিত একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের আর্থিক দুর্বলতা, খাবারের বৈচিত্র্য, মানসিক স্বাস্থ্য এবং শিক্ষাগত ফলাফলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকের মধ্যে গুরুতর বিষণ্নতার সম্ভাব্য লক্ষণ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে দেখা গেছে, যেসব শিক্ষার্থী বেশি আর্থিক সংকটে ছিলেন, তাদের মধ্যে বিষণ্নতার উপসর্গ তুলনামূলক বেশি ছিল।
অন্যদিকে, যারা তুলনামূলক বৈচিত্র্যময় খাবার গ্রহণ করতেন, তাদের মধ্যে বিষণ্নতার উপসর্গ কম দেখা গেছে।
তবে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, এই গবেষণা থেকে সরাসরি বলা যায় না যে অর্থকষ্ট বা কম বৈচিত্র্যময় খাবারই বিষণ্নতার কারণ। একইভাবে বিষণ্নতার কারণে ফলাফল খারাপ হচ্ছে—এমন সরাসরি সিদ্ধান্তও দেওয়া যায় না। বরং গবেষণাটি দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক চাপ, পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন সমস্যা কীভাবে একই সময়ে একজন শিক্ষার্থীর জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণাটি ২০২৬ সালের মার্চ মাসে পরিচালিত হয়। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে চারটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১০০ জন করে মোট ৪০০ জন শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন। তবে গবেষণার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নাম প্রকাশ করা হয়নি এবং গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে এই ফলাফল দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করে না।
শিক্ষার্থীদের আর্থিক সংকট বোঝার জন্য গবেষকরা একটি আটটি প্রশ্নের সূচক ব্যবহার করেন। এতে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় খরচ, খাবার, যাতায়াত, যোগাযোগ খরচ, পড়াশোনার উপকরণ কেনা, বেতন বা ফি দিতে দেরি হওয়া, ঋণ নেওয়া, অর্থের অভাবে খাবার বাদ দেওয়া এবং আর্থিক চাপের কারণে মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এরপর ছিল আর্থিক সমস্যার কারণে ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারার সমস্যা।
অনেক শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনা, যাতায়াত খরচ বহন করা কিংবা নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা নিয়েও চিন্তা করতে হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, আর্থিক দুর্বলতার মাত্রা যত বেশি ছিল, বিষণ্নতার উপসর্গও তত বেশি হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এমনকি বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষাবর্ষ, আবাসন ব্যবস্থা, পারিবারিক শিক্ষা, পড়াশোনার সময়, ঘুম এবং শারীরিক কার্যক্রমের মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল।
শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নয়, আর্থিক সংকট শিক্ষাগত ফলাফলেও প্রভাব ফেলেছে। গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, আর্থিক দুর্বলতার সূচকে ১০ পয়েন্ট পার্থক্যের সঙ্গে সিজিপিএতে প্রায় ০.১৯ পয়েন্ট পার্থক্য দেখা গেছে।
অর্থাৎ অর্থনৈতিক চাপ শুধু ব্যক্তিগত উদ্বেগ তৈরি করে না, এটি একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনার সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল খাবারের ধরন।গবেষণায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের আগের ২৪ ঘণ্টায় কী ধরনের খাবার গ্রহণ করেছেন, তা জানতে ১২টি খাদ্যগোষ্ঠীর ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
দেখা গেছে, ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থী শস্যজাতীয় খাবার গ্রহণ করেছেন এবং ৭৮ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী সবজি খেয়েছেন।
তবে ফল খাওয়ার হার ছিল তুলনামূলক কম। মাত্র ৪৬ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী ফল গ্রহণ করেছেন। দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণ করেছেন ৪২ দশমিক ২ শতাংশ এবং মাংস ও পোলট্রি জাতীয় খাবার গ্রহণ করেছেন ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী।
গড়ে একজন শিক্ষার্থী ১২টি খাদ্যগোষ্ঠীর মধ্যে ৭ দশমিক ৬৭টি গোষ্ঠীর খাবার গ্রহণ করেছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি বৈচিত্র্যময় খাবার খেয়েছেন, তাদের মধ্যে বিষণ্নতার উপসর্গ তুলনামূলক কম ছিল। একই সঙ্গে তাদের শিক্ষাগত ফলাফলও কিছুটা ভালো হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।
গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতিটি অতিরিক্ত খাদ্যগোষ্ঠীর সঙ্গে সিজিপিএতে প্রায় ০.০৩১ পয়েন্ট বৃদ্ধি দেখা গেছে। পাঁচ ধরনের খাবারের পার্থক্যে এই ব্যবধান প্রায় ০.১৫ পয়েন্ট হতে পারে।
তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন, খাবারের বৈচিত্র্য মানেই সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নয়। কারণ এই পরিমাপে খাবারের ধরন বিবেচনা করা হয়েছে, কিন্তু খাবারের পরিমাণ, পুষ্টিমান বা দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণ করা হয়নি।
গবেষণায় শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নে বহুল ব্যবহৃত একটি প্রশ্নমালা ব্যবহার করা হয়, যেখানে গত দুই সপ্তাহে বিষণ্নতার বিভিন্ন উপসর্গের মাত্রা পরিমাপ করা হয়েছে।
৪০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে বিষণ্নতার কোনো বা খুব সামান্য লক্ষণ পাওয়া গেছে। ১৯ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে ছিল হালকা মাত্রার উপসর্গ।
মাঝারি মাত্রার উপসর্গ ছিল ১৬ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে। ১৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে ছিল মাঝারি থেকে গুরুতর পর্যায়ের উপসর্গ এবং ১৬ শতাংশের মধ্যে গুরুতর উপসর্গ পাওয়া গেছে।
সব মিলিয়ে ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী এমন স্কোর করেছেন, যা সম্ভাব্য গুরুতর বিষণ্নতার ঝুঁকি নির্দেশ করে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী চিকিৎসাগতভাবে বিষণ্নতায় আক্রান্ত। কারণ ব্যবহৃত প্রশ্নমালা ছিল একটি প্রাথমিক শনাক্তকরণ পদ্ধতি, চিকিৎসাগত রোগ নির্ণয় নয়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী এমন প্রশ্নের উত্তরে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন যেখানে গত দুই সপ্তাহে নিজের ক্ষতি করার চিন্তা বা জীবন নিয়ে হতাশার অনুভূতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল।
মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থার সঙ্গেও শিক্ষাগত ফলাফলের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিষণ্নতার মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সিজিপিএ কমার প্রবণতা দেখা গেছে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, গুরুতর বিষণ্নতার পর্যায়ে থাকা একজন শিক্ষার্থীর সিজিপিএ একই ধরনের অন্য একজন শিক্ষার্থীর তুলনায় গড়ে প্রায় ০.৩৮ পয়েন্ট কম হতে পারে।
গবেষকরা জোর দিয়ে বলেছেন, এই গবেষণা কোনো কারণ-ফল সম্পর্ক প্রমাণ করে না। কারণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে একটি নির্দিষ্ট সময়ে।
অর্থাৎ আর্থিক সমস্যা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে, আবার মানসিক সমস্যার কারণে একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও খারাপ হতে পারে।
এ ছাড়া খাবারের তথ্য ও সিজিপিএসহ অনেক তথ্য শিক্ষার্থীরা নিজেরাই দিয়েছেন। ফলে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রভাব থাকতে পারে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও দেশের সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের প্রতিষ্ঠান এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
গবেষকরা আরও উল্লেখ করেছেন, পারিবারিক আয়, পড়াশোনার চাপ, সামাজিক সহায়তা, ব্যক্তিত্ব এবং পূর্বের মানসিক স্বাস্থ্যের ইতিহাসের মতো বিষয়গুলোও এই সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।
তবুও গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে—শিক্ষার্থীদের কল্যাণকে শুধু ভালো ফলাফল বা শ্রেণিকক্ষের পারফরম্যান্স দিয়ে বিচার করা যাবে না।
অর্থনৈতিক সহায়তা, সহজলভ্য পুষ্টিকর খাবার এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি আর্থিকভাবে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়তা ব্যবস্থা, কম খরচে পুষ্টিকর খাবারের সুযোগ এবং সহজে পাওয়া যায় এমন মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে, তাহলে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক জীবনমান উন্নত হতে পারে।
তবে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিশ্চিত করতে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
কারণ একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য শুধু তার মেধার ওপর নির্ভর করে না; তার চারপাশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক পরিবেশও সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

