এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনটি কারও জন্য আনন্দের, আবার কারও জন্য গভীর হতাশার। কোথাও সাফল্যের উচ্ছ্বাস, পরিবারের মুখে হাসি; আবার কোথাও ফল খারাপ হওয়ায় নীরবে কষ্টে থাকা কিশোর-কিশোরী। প্রায় এক দশকের শিক্ষাজীবন শেষে একটি পরীক্ষার ফলই যেন হঠাৎ তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়।
তবে এ বছরের ফলাফল শুধু কে পাস করল আর কে ফেল করল—এই হিসাবেই দেখলে বিষয়টির বড় অংশই অদেখা থেকে যাবে। কারণ, এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—এটি কি কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, নাকি এর পেছনে শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতাও রয়েছে?
এ বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ। গত ১৯ বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন। ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৬৮.৪৫ শতাংশ, আর ২০২৪ সালে ছিল ৮৩.০৪ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই এবার পাস করতে পারেনি।
এই পরিসংখ্যানকে শুধু পরীক্ষার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এগুলো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। কেন এত শিক্ষার্থী ব্যর্থ হলো, তার একক কোনো উত্তর নেই। বরং প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে জমে থাকা দুর্বলতাগুলোই হয়তো এসএসসি পরীক্ষায় এসে একসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে।
ইংরেজি ও গণিতের ফলাফল বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে ইংরেজিতে পাসের হার ৬৬.৬৪ শতাংশ থেকে ৮১.২৯ শতাংশের মধ্যে ছিল। ৯টি বোর্ডের মধ্যে ৭টিতেই এ বিষয়ে পাসের হার ৭৫ শতাংশের নিচে। গণিতে পাসের হার ছিল ৬৯.৬১ শতাংশ থেকে ৮৩.৩৪ শতাংশের মধ্যে।
কিন্তু দশম শ্রেণিতে উঠেই কোনো শিক্ষার্থী ইংরেজি বা গণিতে দুর্বল হয়ে যায় না। প্রাথমিক পর্যায়েই যদি একটি শিশু ভালোভাবে পড়তে না পারে, ভাষা বুঝতে সমস্যা হয়, মৌলিক হিসাব বা সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে না ওঠে, তাহলে সময়ের সঙ্গে সেই ঘাটতি আরও বড় হয়।
প্রাথমিক শিক্ষার বাস্তব চিত্রও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। ঢাকার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের ২ হাজার ১০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়ে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী মৌলিক গুণ ও ভাগ করতে সমস্যায় পড়ে এবং সহজ ইংরেজি নির্দেশনাও পড়তে পারে না। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পঞ্চম শ্রেণি শেষে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী ন্যূনতম দক্ষতার স্তরে পৌঁছাতে পারে না।
ফলে দশম শ্রেণিতে কয়েক মাসের পরীক্ষার প্রস্তুতি দিয়ে বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া শেখার ঘাটতি পূরণ করা কঠিন। এ কারণেই এসএসসিতে ব্যর্থতাকে অনেক ক্ষেত্রে আরও পুরোনো সমস্যার চূড়ান্ত প্রকাশ হিসেবে দেখা দরকার।
এখানে শিক্ষকদের দায়িত্ব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে পুরো দায় শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে দিলেও সমস্যার সমাধান হবে না। প্রশ্ন করতে হবে—বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক আছেন কি না, শিক্ষকেরা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক সহায়তা পাচ্ছেন কি না, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কত, বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও তদারকি কতটা কার্যকর।
দেশের ৬৫ হাজার ৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। আবার ১৩ হাজার ৫০০ সহকারী শিক্ষকের পদও খালি। মাধ্যমিক পর্যায়েও একই ধরনের সংকট রয়েছে। দেশের ৫৫ শতাংশ উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়া এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
এর সঙ্গে রয়েছে শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতির সমস্যা। একটি শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি থাকলেই যে নিয়মিত পড়াশোনা করছে, তা নয়। পরিবারের আর্থিক চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব, আগ্রহ হারিয়ে ফেলা কিংবা নানা সামাজিক কারণে অনেক শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমে যায়। একবার পড়াশোনায় ছন্দপতন হলে শেখার ঘাটতি দ্রুত বাড়তে থাকে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের গত বছরের এক জরিপেও বিষয়টি উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের নিট উপস্থিতির হার ৮৪.৩ শতাংশ হলেও ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে তা নেমে আসে ৫৯.৬ শতাংশে। নবম ও দশম শ্রেণিতে এই হার আরও কমে দাঁড়ায় ৫০.৫ শতাংশে।
এবার যে ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই এসএসসিতে পাস করতে পারেনি, সেগুলো নিয়ে দ্রুত ও গভীর পর্যালোচনা হওয়া জরুরি। একটি বিদ্যালয়ের সব পরীক্ষার্থী যখন ব্যর্থ হয়, তখন সেটিকে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না।
খতিয়ে দেখা প্রয়োজন—বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক ছিলেন কি না, নিয়মিত ক্লাস হয়েছে কি না, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন ছিল, দুর্বল শিক্ষার্থীদের আগেই চিহ্নিত করা হয়েছিল কি না এবং তাদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তার ব্যবস্থা ছিল কি না। একই সঙ্গে প্রধান শিক্ষক, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি এবং স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাদের ভূমিকারও মূল্যায়ন করা দরকার।
তবে তদন্তের উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষক বা প্রশাসকদের শাস্তি দেওয়া হওয়া উচিত নয়। বরং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কোথায় সমস্যা এবং কেন শিক্ষার্থীরা ন্যূনতম শেখার দক্ষতাও অর্জন করতে পারেনি, সেটি চিহ্নিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। এরপর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উন্নতির জন্য কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে।
যারা এবার এসএসসিতে সফল হতে পারেনি, তাদের প্রতিও দায়িত্ব রয়েছে। তাদের একা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। বিদ্যালয় থেকেই প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করা দরকার। কোন বিষয়ে দুর্বলতা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী অতিরিক্ত পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সহায়তা প্রয়োজন।
অভিভাবকদের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষায় খারাপ ফল করার জন্য সন্তানকে অপমান করা, অন্যদের সঙ্গে তুলনা করা কিংবা একটি ফলাফলকে তার সামগ্রিক যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে দেখা কোনোভাবেই সমাধান নয়। বরং তাকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে হবে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ভবিষ্যতে এমন ব্যর্থতা ঠেকানো। এর জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত অপেক্ষা করলে চলবে না। প্রাথমিক পর্যায় থেকেই এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো শিক্ষার্থী পড়া, লেখা, গণিত, ভাষা, উপস্থিতি কিংবা শ্রেণিকাজে পিছিয়ে পড়লে দ্রুত তা শনাক্ত করা যায়।
যে শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ছে, তাকে বছরের পর বছর দুর্বলতা নিয়ে পরের শ্রেণিতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে শুরুতেই প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। ইংরেজি ও গণিতে দক্ষ শিক্ষক বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্বল বিদ্যালয়গুলোর জন্য বিশেষ একাডেমিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও শুধু মাঝে মাঝে কর্মশালা আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের কীভাবে শেখানো হচ্ছে, কোথায় সমস্যা হচ্ছে এবং কীভাবে তা দূর করা যায়—এসব বিষয়ে নিয়মিত একাডেমিক সহায়তা প্রয়োজন। একইভাবে বিদ্যালয় তদারকির ক্ষেত্রেও শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়, শিক্ষার্থীরা আসলে কতটা শিখছে, সেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
এবারের ফলাফল নিয়ে বোর্ড, বিষয়, অঞ্চল, বিদ্যালয়ের ধরন ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শ্রেণি অনুযায়ী বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। শুধু কোথায় কতজন ফেল করেছে তা জানলেই হবে না; কেন ফেল করেছে, সেটিও জানতে হবে।
এসএসসি পাস হওয়া প্রায় ১০ বছরের অর্থবহ শিক্ষার স্বাভাবিক ফল হওয়া উচিত। দশম শ্রেণিতে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির ফল হওয়া উচিত নয়। এবারের ফলাফলকে চাইলে সাময়িক বিতর্ক হিসেবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায়। আবার চাইলে এটিকে শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা দূর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবেও নেওয়া যায়।
আজ যারা ব্যর্থ হয়েছে, তাদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করা এবং আগামী দিনের শিক্ষার্থীরা যাতে ব্যর্থতার পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই প্রয়োজনীয় সহায়তা পায়—এই দুই দায়িত্বই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পাসের হার বাড়ানো নয়, শিক্ষার্থীরা সত্যিকার অর্থে শিখছে কি না—সেটিই হওয়া উচিত শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি।

