স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার পরিসর যে কতটা বড় হয়েছে, তার সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা। ১৯৭১ সালে দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মাত্র ৬টি। পাঁচ দশকের ব্যবধানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৯টিতে। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩০ গুণ।
এই বিস্তার নিঃসন্দেহে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, বেড়েছে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়—বিশ্ববিদ্যালয় যতটা বেড়েছে, সেই অনুপাতে কি গবেষণা বেড়েছে? বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কি বাড়ছে? আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করার মতো পরিবেশ কি তৈরি হয়েছে?
পরিসংখ্যান বলছে, সংখ্যার বিস্তারের সঙ্গে মানের অগ্রগতি একই গতিতে হয়নি। গবেষণা প্রকাশনা, বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিং এবং বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণের ক্ষেত্রে এখনো বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বেশ পিছিয়ে।
ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৭৯
স্বাধীনতার আগে এই অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় পূর্ববঙ্গে একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন এ অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
পরে ধীরে ধীরে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬১ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬২ সালে তৎকালীন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়, ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৭০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে স্বাধীনতার ঠিক আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬টিতে।
স্বাধীনতার পর উচ্চশিক্ষাকে রাষ্ট্র গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পাশাপাশি জ্ঞান ও গবেষণার বিকাশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে শুরু করে।
তবে স্বাধীনতার প্রথম দুই দশকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার গতি খুব বেশি ছিল না। ১৯৭১ সালের ৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ১৯৯০ সালের আগ পর্যন্ত যুক্ত হয় আরও মাত্র ২টি। ফলে দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছিল।
পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে নব্বইয়ের দশকে। উচ্চশিক্ষার চাহিদা বাড়ছিল, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসনসংকট তৈরি হচ্ছিল এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের সংখ্যা বাড়ছিল। এই বাস্তবতায় বেসরকারি খাতকে উচ্চশিক্ষায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯৯২ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন সেই পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়। এরপর দ্রুত বাড়তে থাকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা। একই সময়ে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষাকে আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী দেশে বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ১৭৯টি। এর মধ্যে ৫৯টি পাবলিক, ১১৬টি প্রাইভেট, ৩টি আন্তর্জাতিক এবং ১টি ক্রস-বর্ডার হায়ার এডুকেশন প্রতিষ্ঠান।
অর্থাৎ সুযোগের দিক থেকে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন—এই বিপুল বিস্তার কি উচ্চশিক্ষার মান ও গবেষণার সক্ষমতার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে?
ভারতের তুলনায় গবেষণায় বড় ব্যবধান
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এবং গবেষণা সক্ষমতার তুলনা করলে বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৩০০। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ৫৭টি, স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় ৫২২টি, ডিমড-টু-বি বিশ্ববিদ্যালয় ১৬১টি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৫৬০টি।
পাকিস্তানে বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৭৮টি। এর মধ্যে ১৬৩টি সরকারি অর্থায়নে এবং ১১৫টি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ভারতের তুলনায় অনেক কম হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু বড় প্রশ্ন তৈরি হয় গবেষণা ও বৈশ্বিক উপস্থিতির জায়গায়।
সিমাগো জার্নাল অ্যান্ড কান্ট্রি র্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারত থেকে গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৫২৪টি। পাকিস্তানের প্রকাশনা ৪৫ হাজার ৫৭৬টি। আর বাংলাদেশের প্রকাশনা ১৯ হাজার ৫৫টি।
অর্থাৎ বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যা প্রায় ২০ গুণ বেশি। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ প্রায় আড়াই গুণ পিছিয়ে।
এখানে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দিয়ে পার্থক্য ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ গবেষণার জন্য প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, গবেষণাগার, তথ্য ও উপাত্তের সহজপ্রাপ্যতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং গবেষণার ফলাফল প্রকাশ ও প্রয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ।
বিশ্ব র্যাংকিংয়েও একই চিত্র
বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অবস্থান বিবেচনা করলেও বাংলাদেশের অগ্রগতি সীমিত।
কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংস ২০২৭-এ বাংলাদেশের ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। একই তালিকায় ভারতের ৫২টি এবং পাকিস্তানের ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই বিশ্বের শীর্ষ ৫০০-তে নেই। দেশের সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৬০০তম অবস্থানে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৭১১-৭২০তম এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অবস্থান ৯০১-৯৫০তম।
ভারতের সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকা আইআইটি দিল্লি রয়েছে ১১৮তম স্থানে।
গত এক দশকে কিউএস র্যাংকিংয়ে ভারতের প্রতিনিধিত্বকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৪ থেকে বেড়ে ৫২টিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ভারত শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ায়নি, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক গবেষণা ও একাডেমিক সক্ষমতাও শক্তিশালী করেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয় বেড়েছে দ্রুত, কিন্তু বিশ্বমানের গবেষণা ও আন্তর্জাতিক অবস্থান তৈরির ক্ষেত্রে সেই গতি দেখা যায়নি।
গবেষণা বাড়ছে, কিন্তু প্রশ্ন থাকছে মান নিয়ে
তবে বাংলাদেশের গবেষণা একেবারেই বাড়ছে না—এমনটি বলা ঠিক হবে না।
অনলাইন ম্যাগাজিন সায়েন্টিফিক বাংলাদেশ-এর বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, স্কোপাস-ইনডেক্সড জার্নাল, কনফারেন্স প্রসিডিংস ও বুক সিরিজে বাংলাদেশের গবেষণা প্রকাশনা ২০২৪ সালের ১৫ হাজার ৪১৩টি থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১৮ হাজার ৬১৩টিতে দাঁড়িয়েছে।
এক বছরে প্রকাশনা বেড়েছে ৩ হাজার ২০০টি। প্রবৃদ্ধির হার ২০ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
দক্ষিণ এশিয়ায় ২০২৫ সালে গবেষণা প্রকাশনার প্রবৃদ্ধির হারে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে ছিল মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান। তাদের প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ ও ৪৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ। তবে মোট গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যায় তারা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
বাংলাদেশে ২০২৫ সালে গবেষণার প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে ছিল প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞান।
গবেষণা প্রকাশনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল শীর্ষে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশনার সংখ্যা ১ হাজার ৭৩১টি। এরপর রয়েছে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। শীর্ষ তালিকায় আরও রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও শিক্ষকপ্রতি প্রকাশনার হার একের নিচে। অর্থাৎ সামগ্রিক প্রকাশনা বাড়লেও বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষকসংখ্যার তুলনায় গবেষণার হার এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
গবেষণার টাকা আসছে কোথা থেকে?
গবেষণার জন্য অর্থায়ন বাংলাদেশের অন্যতম বড় দুর্বলতা।
২০২৫ সালের গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষ ১৫টি গবেষণা অর্থায়নকারী সংস্থার ৯টিই বিদেশি। দেশীয় অর্থায়নকারীদের মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় রয়েছে শীর্ষে। এরপর রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
কিন্তু শিল্প, কৃষি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের সঙ্গে গবেষণার অর্থায়নের সম্পর্ক এখনো তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
আরও বড় উদ্বেগের জায়গা হলো গবেষণার ফলাফল বাস্তবে কতটা কাজে লাগছে। ২০২৫ সালের গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো পেটেন্ট রেকর্ড না থাকার তথ্য উঠে এসেছে।
অর্থাৎ গবেষণাপত্র প্রকাশ হচ্ছে, কিন্তু সেই গবেষণা থেকে নতুন প্রযুক্তি, উদ্ভাবন কিংবা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য পণ্য ও সেবা কতটা তৈরি হচ্ছে, তা এখনো বড় প্রশ্ন।
বিদেশি শিক্ষার্থীও আসছে কম
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান খুব শক্তিশালী নয়।
ভারত প্রায় ২০০টি দেশ থেকে ৭২ হাজারের বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী গ্রহণ করছে। পাকিস্তানে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০।
বাংলাদেশে এই সংখ্যা প্রায় ৬৩৩।
১৭৯টি বিশ্ববিদ্যালয় থাকা একটি দেশের জন্য এই সংখ্যা খুবই কম। এটি শুধু বিদেশি শিক্ষার্থী কম আসার বিষয় নয়; বরং বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিকভাবে কতটা আকর্ষণীয়, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে একটি বৈশ্বিক শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ করতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ালে হবে না। শিক্ষার মান, গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শিক্ষকদের দক্ষতা, আবাসন ও শিক্ষা পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পাঠ্যক্রম—সব ক্ষেত্রেই উন্নতি করতে হবে।
সমস্যা শুধু অর্থের নয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আবদুস সালামের মতে, দেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পরিমাণগত বিস্তার হয়েছে, কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনভিত্তিক পরিকল্পনা ও গবেষণার ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সব বিশ্ববিদ্যালয়কে একই ধরনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাভিত্তিক এবং অন্যগুলোকে মূলত শিক্ষাদানকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন ছিল।
গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রয়োজন বিবেচনায় নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করবে। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নতুন বিষয় ও বিভাগ চালু করবে। কিন্তু সেই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।
এখনো এমন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে জমি অধিগ্রহণ, ভবন নির্মাণ, গ্রন্থাগার এবং শিক্ষক নিয়োগের মতো মৌলিক কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। কোথাও কোথাও মাত্র ৪ থেকে ৫ জন শিক্ষক দিয়ে একটি বিভাগ পরিচালনা করা হচ্ছে।
ফলে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃষ্টি ও গবেষণার কেন্দ্র হওয়ার বদলে কেবল সনদ দেওয়ার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিপুলসংখ্যক কলেজ পরিচালনার বিষয়টিও এই বৃহত্তর উচ্চশিক্ষা সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাহলে করণীয় কী?
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা থেকে বের হয়ে এখন মানের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
প্রথমত, কোন বিশ্ববিদ্যালয় কী ধরনের ভূমিকা পালন করবে, সেটি নির্ধারণ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের একই লক্ষ্য থাকার দরকার নেই। কিছু প্রতিষ্ঠান বিশ্বমানের গবেষণা করবে, কিছু প্রতিষ্ঠান দক্ষ পেশাজীবী তৈরি করবে এবং কিছু প্রতিষ্ঠান আঞ্চলিক চাহিদা অনুযায়ী উচ্চশিক্ষা দেবে—এমন একটি সমন্বিত কাঠামো প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, গবেষণায় অর্থায়ন বাড়ানোর পাশাপাশি সেই অর্থের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যা বাড়ানোকে সাফল্যের মাপকাঠি বানালে হবে না। গবেষণা থেকে প্রযুক্তি, পেটেন্ট, উদ্ভাবন এবং শিল্পখাতে ব্যবহারযোগ্য সমাধান তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় আনতে হবে।
তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা জরুরি। বাস্তব সমস্যার সমাধানে গবেষকদের যুক্ত করা গেলে গবেষণার গুরুত্ব যেমন বাড়বে, তেমনি শিল্প খাতও নতুন প্রযুক্তি ও জ্ঞান থেকে উপকৃত হবে।
চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রেখে একাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। গবেষক ও শিক্ষকরা যদি স্বাধীনভাবে গবেষণা করতে না পারেন, তাহলে আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান সৃষ্টি সম্ভব নয়।
অধ্যাপক আবদুস সালাম শিক্ষা খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ থেকে ৭ শতাংশ বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, কী ধরনের গবেষণা হচ্ছে এবং তার ফলাফল সমাজ ও অর্থনীতিতে কীভাবে কাজে লাগছে—সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
সংখ্যার সাফল্য থেকে মানের সাফল্যে যেতে হবে
স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মাত্র ৬টি। এখন ১৭৯টি। এই পরিবর্তনকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেশের মানুষের কাছে আগের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত হয়েছে।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি নিজে কোনো দেশের জ্ঞানভিত্তিক অগ্রগতির নিশ্চয়তা দেয় না।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি নির্ধারিত হয় তার শিক্ষক, গবেষণা, উদ্ভাবন, একাডেমিক স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সমাজ ও অর্থনীতিতে তার অবদানের মাধ্যমে।
বাংলাদেশ এখন সেই জায়গাতেই আটকে আছে। সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সেই সংখ্যার সঙ্গে সমান তালে বাড়েনি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা।
তাই আগামী দিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কতটি হলো, সেই হিসাব নয়; বরং বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে কতটি বিশ্বমানের গবেষণা করছে, কতটি নতুন জ্ঞান তৈরি করছে এবং কতটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে পারছে—সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার পরবর্তী অধ্যায় তাই সংখ্যা বাড়ানোর নয়, মান বাড়ানোর হওয়া উচিত।

