বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে মুখস্থনির্ভর ফলাফলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সাফল্য অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করে কতটা ভালোভাবে একটি নির্দিষ্ট উত্তর, সূত্র বা অনুচ্ছেদ মনে রেখে পরীক্ষার খাতায় লিখতে পারছে তার ওপর। জিপিএ-৫ তাই অনেক সময় জ্ঞান বা বিষয়টি গভীরভাবে বোঝার চেয়ে নির্ধারিত উত্তর কতটা নিখুঁতভাবে পুনরুৎপাদন করা যায়, তারই প্রতিফলন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ এই পুরোনো শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। যে তথ্য মুখস্থ করা, দ্রুত খুঁজে বের করা কিংবা পরিচিত ধরনের সমস্যা সমাধান করতে একজন শিক্ষার্থীর দীর্ঘ সময় লাগে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেটিই কয়েক মুহূর্তে করে দিতে পারে। ফলে শুধু তথ্য মনে রাখা বা আগে থেকে শেখানো কোনো উত্তর পুনরায় লিখতে পারার দক্ষতার মূল্য ভবিষ্যতে আরও কমবে।
মানুষের চিন্তাভাবনাকে মোটামুটি দুটি স্তরে দেখা যায়। একটি হলো তথ্য মনে রাখা, তা বোঝা এবং পরিচিত পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করা। বাংলাদেশের বর্তমান পাঠ্যক্রম, কোচিং ব্যবস্থা এবং বোর্ড পরীক্ষা দীর্ঘদিন ধরে মূলত এই ধরনের দক্ষতাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছে।
অন্য স্তরটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ—কোনো বিষয় বিশ্লেষণ করা, বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করা, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো, নৈতিকতার প্রশ্ন বিবেচনা করা এবং এমন সমস্যার নতুন সমাধান তৈরি করা যার কোনো মুখস্থ উত্তর নেই। ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোর গুরুত্ব বাড়লেও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এগুলো এখনো পর্যাপ্তভাবে মূল্যায়িত হয় না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রথম ধরনের কাজগুলোতেই সবচেয়ে বেশি দক্ষ হয়ে উঠছে। বিপুল তথ্য সংরক্ষণ, দ্রুত তথ্য খুঁজে বের করা এবং পরিচিত ধরনের সমস্যার সমাধান করা যন্ত্রের জন্য তুলনামূলক সহজ। একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা কয়েক সেকেন্ডে ইংরেজি রচনা লিখতে পারে কিংবা বোর্ড পরীক্ষার গণিতের একটি প্রশ্ন সমাধান করে দিতে পারে। ফলে যে দক্ষতাকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বছরের পর বছর ধরে পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে আসছে, সেই দক্ষতার বাজারমূল্যই যদি কমে যায়, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য নিয়েই নতুন করে ভাবতে হবে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি আরও বড়। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সহায়ক বই, নোট ও প্রস্তুত উত্তর শিক্ষার্থীদের এমন একটি অভ্যাসে অভ্যস্ত করেছে, যেখানে নিজে চিন্তা করার পরিবর্তে পরীক্ষায় কী লিখলে ভালো নম্বর পাওয়া যাবে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই পুরোনো প্রবণতাকেই আরও শক্তিশালী করতে পারে। আগে শিক্ষার্থীকে একটি নোট বা সহায়ক বই থেকে উত্তর মুখস্থ করতে হতো। এখন একই কাজ আরও দ্রুত, ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী এবং প্রায় সীমাহীনভাবে করা সম্ভব। ফলে শিক্ষার্থী নিজে না ভেবে যন্ত্রের কাছ থেকে উত্তর নেওয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।
এতে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, এমন একটি প্রজন্ম তৈরি হতে পারে যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নির্দেশ দিতে জানে, কিন্তু তার দেওয়া তথ্য সত্য কি না তা যাচাই করতে জানে না; কোনো যুক্তির দুর্বলতা ধরতে পারে না কিংবা পাওয়া উত্তরের ওপর ভিত্তি করে নিজের নতুন চিন্তা তৈরি করতে পারে না।
মনোবিজ্ঞানে নিজের চিন্তার পরিবর্তে বাইরের কোনো ব্যবস্থা বা যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করার প্রবণতাকে জ্ঞানগত ভারমুক্তি হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশে এটি মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পুরোনো সমস্যার প্রযুক্তিনির্ভর নতুন রূপ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এর সমাধান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শ্রেণিকক্ষ থেকে নিষিদ্ধ করা নয়। বরং শিক্ষা ব্যবস্থাকেই এমনভাবে পরিবর্তন করতে হবে, যাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষার্থীর চিন্তার বিকল্প না হয়ে চিন্তাকে আরও গভীর করার সহায়ক হয়।
এখানে সবচেয়ে আগে পরিবর্তন দরকার পরীক্ষাপদ্ধতিতে। কারণ পরীক্ষা যদি এখনো মুখস্থ উত্তর পুনরুৎপাদন করাকেই পুরস্কৃত করে, তাহলে পাঠ্যক্রমে যত পরিবর্তনই আনা হোক না কেন, শিক্ষার্থী ও কোচিং প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত পুরোনো পরীক্ষার ধরন অনুযায়ী প্রস্তুতি নেবে।
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ধীরে ধীরে এমন প্রশ্ন বাড়ানো যেতে পারে, যেখানে শুধু সঠিক উত্তর জানলেই হবে না; শিক্ষার্থীকে নিজের যুক্তি ব্যাখ্যা করতে হবে, কোনো সমস্যার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করতে হবে, একটি মতের পক্ষে বা বিপক্ষে যুক্তি দিতে হবে কিংবা নতুন কোনো সমাধান প্রস্তাব করতে হবে।
এ ধরনের পরিবর্তন শ্রেণিকক্ষের আচরণেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই তখন বুঝতে পারবেন যে মুখস্থ করে পাওয়া উত্তর দিয়ে ভালো ফল করা যথেষ্ট নয়। নিজের চিন্তা ও যুক্তি প্রকাশ করতে পারাটাই হয়ে উঠবে সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি।
বিশ্লেষণী ও মূল্যায়নমূলক চিন্তার চর্চা অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গিয়ে শুরু করলে চলবে না। নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই এর ভিত্তি তৈরি করা প্রয়োজন। সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির মতো পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের এমন কাজ দেওয়া যেতে পারে, যেখানে কোনো চরিত্রের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করতে হবে, নৈতিক কোনো প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক করতে হবে অথবা প্রচলিত সমস্যার নতুন সমাধান খুঁজতে হবে।
এসব কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহায়তা করতে পারে, কিন্তু পুরো কাজটি শিক্ষার্থীর হয়ে করা উচিত নয়। বরং এমন ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার, যা সরাসরি উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করবে, তার যুক্তির দুর্বলতা ধরিয়ে দেবে এবং তাকে আরও গভীরভাবে ভাবতে উৎসাহিত করবে।
এ ধরনের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ সীমিত সংখ্যক বিদ্যালয়ে শুরু করা যেতে পারে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ যৌথভাবে এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষাসহায়ক ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করতে পারে, যেখানে উত্তর দেওয়ার চেয়ে প্রশ্ন করা এবং শিক্ষার্থীর চিন্তাকে পরিচালনা করাই হবে মূল উদ্দেশ্য।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বাংলাদেশের আলোচনায় শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেলেও শিক্ষকদের প্রস্তুতির বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হচ্ছে।
একজন শিক্ষক যদি না জানেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী ধরনের কাজ করতে পারে, তাহলে তিনি এমন কোনো শিক্ষাকাজও তৈরি করতে পারবেন না যেখানে শিক্ষার্থী শুধু যন্ত্রের কাছ থেকে উত্তর এনে জমা দিতে পারবে না। ফলে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ছাড়া শ্রেণিকক্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর ব্যবহার প্রায় অসম্ভব।
শিক্ষকদের এমন প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, যেখানে তাদের শেখানো হবে কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর নকল বা প্রস্তুত উত্তর শনাক্ত করা যায়, কীভাবে বিশ্লেষণমূলক কাজ তৈরি করা যায় এবং কীভাবে প্রযুক্তিকে শিক্ষার্থীর চিন্তার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
এ ক্ষেত্রে বড় পরিসরে একবারে জাতীয় নীতি চাপিয়ে দেওয়ার চেয়ে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ বেশি কার্যকর হতে পারে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগগুলো নির্বাচিত জেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালাতে পারে। এসব উদ্যোগের ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে নিয়মিত মূল্যায়ন করা হলে ভবিষ্যতের জাতীয় নীতি বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি করা সম্ভব হবে।
তবে বাংলাদেশের বাস্তবতাও মাথায় রাখতে হবে। রাজধানী বা বড় শহরের বিদ্যালয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা তুলনামূলক সহজ হলেও গ্রামাঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থীর ইন্টারনেট, যন্ত্র এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ সীমিত। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবিধা দিতে গিয়ে যদি শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন বৈষম্য তৈরি হয়, তাহলে উদ্যোগটি উল্টো ফল দিতে পারে।
শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার তাই শুধু প্রযুক্তি কেনা বা শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন কোনো সফটওয়্যার তুলে দেওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো এবং শিক্ষার উদ্দেশ্য— সবকিছুর পরিবর্তন জড়িত।
শিল্পবিপ্লব যেমন মানুষের শারীরিক শ্রমের ধরন বদলে দিয়েছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তেমনি মানুষের মানসিক শ্রমের অনেক প্রচলিত কাজকে পরিবর্তন করছে। সেই বাস্তবতা অস্বীকার করে পুরোনো পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী তৈরি করলে তারা ভবিষ্যতের কর্মক্ষেতরে পিছিয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের সামনে তাই মূল প্রশ্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শিক্ষাব্যবস্থায় ঢুকতে দেওয়া হবে কি না— সেটি নয়। আসল প্রশ্ন হলো, যেসব কাজ এখন যন্ত্র মানুষের চেয়ে দ্রুত ও দক্ষভাবে করতে পারছে, সেসব কাজই কি আমরা শিক্ষার্থীদের শেখাতে থাকব, নাকি তাদের এমন দক্ষতা গড়ে তুলব যা এখনো মানুষের চিন্তা, বিচারবোধ, সৃজনশীলতা ও নৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল?
ভবিষ্যতের শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য হয়তো আর একজন শিক্ষার্থী কত তথ্য মনে রাখতে পারে, তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং সে কতটা ভালোভাবে প্রশ্ন করতে পারে, তথ্য যাচাই করতে পারে, যুক্তি বিশ্লেষণ করতে পারে এবং নতুন কোনো সমস্যার নিজস্ব সমাধান তৈরি করতে পারে— সেটিই হয়ে উঠবে তার আসল শক্তি।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে এখন তাই প্রযুক্তি গ্রহণের চেয়েও বড় কাজ হলো শিক্ষার দর্শন বদলানো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মুখস্থবিদ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষা ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে।

