বিশেষ বিশ্লেষণ
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাত কলেজকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় যে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন; প্রশাসনিক কাঠামো বদলালেই কি শিক্ষার সংকটের সমাধান হয়?
২০১৭ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছিল শিক্ষার মান উন্নয়ন, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করার প্রত্যাশায়। কিন্তু কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল, সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলাফল হিসেবে শিক্ষার্থীদের সামনে এসেছে সেশনজট, পরীক্ষার ফল প্রকাশে বিলম্ব, অনিশ্চিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার এবং আন্দোলন। এখন আবার ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই সংকটের নতুন সমাধান খোঁজা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো সমস্যার মূল কারণগুলো কি বদলেছে, নাকি শুধু পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের নাম বদলেছে?
২০১৭ থেকে ২০২৬: সিদ্ধান্তের পর সিদ্ধান্ত
সাত কলেজের সাম্প্রতিক ইতিহাস মূলত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ইতিহাস। একসময় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা কলেজগুলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। পরে বিভিন্ন জটিলতা, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে আবার নতুন কাঠামোর চিন্তা সামনে আসে।
২০২৬ সালে আইন করে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্যক্রম নির্ধারণ, পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদ প্রদানের দায়িত্ব পালন করবে, অন্যদিকে কলেজগুলোর নিজস্ব পরিচয়, সম্পত্তি ও প্রশাসনিক কাঠামো সংরক্ষণের কথাও আইনে বলা হয়েছে। কিন্তু কাগজে-কলমে একটি কাঠামো আর বাস্তবে কার্যকর একটি প্রতিষ্ঠান দুটি ভিন্ন বিষয়।
বাংলাদেশের শিক্ষা প্রশাসনের বড় দুর্বলতা এখানেই। অনেক সময় প্রথমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পরে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা তৈরি করার চেষ্টা করা হয়। অথচ হওয়া উচিত ছিল উল্টোটি।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কি নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে?
বর্তমান বিতর্কের অন্যতম বড় বিষয় শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ভবিষ্যৎ। নতুন আইনের অধীনে কোন শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধীনে পড়বে এবং কারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তাদের শিক্ষা শেষ করবে, এ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক ও একাডেমিক সক্ষমতা প্রতিষ্ঠার আগেই শিক্ষার্থীদের এর অধীনে আনার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা স্বাভাবিক, যে প্রতিষ্ঠান এখনো নিজের কাঠামো ও সক্ষমতার প্রমাণ দিতে পারেনি, তার হাতে শিক্ষা কার্যক্রম তুলে দিলে আবার কি নতুন ধরনের সেশনজট তৈরি হবে?
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্বাসযোগ্যতা।
একজন শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি নাম নয়। তার সনদের গ্রহণযোগ্যতা, উচ্চশিক্ষার সুযোগ, চাকরির বাজারে মূল্য এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, সবকিছুই সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। ফলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে শিক্ষার্থীদের আস্থা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
শিক্ষক, কলেজ ও উচ্চমাধ্যমিক; তিন স্তরের উদ্বেগ
সাত কলেজের সংকট শুধু শিক্ষার্থীদের নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছেন বিপুলসংখ্যক শিক্ষক এবং কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী কলেজের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও।
বর্তমানে বহু শিক্ষক বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের অধীনে কর্মরত। ভবিষ্যতে কলেজগুলো পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোয় গেলে তাদের চাকরির অবস্থান, পদমর্যাদা ও প্রশাসনিক পরিচয় কী হবে সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।
অন্যদিকে, কয়েকটি কলেজে এখনো উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম রয়েছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো সেই কার্যক্রমের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, সেটিও পরিষ্কার নয়। ফলে শিক্ষা সংস্কারের নামে যদি বিদ্যমান একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে সেটিকে সংস্কার বলা যাবে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন। সাত কলেজ দীর্ঘদিন ধরে এমন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য সুযোগ তৈরি করেছে, যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেনি কিংবা ব্যয়বহুল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সামর্থ্য রাখে না। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী এসব কলেজে ভর্তি হয়। এই প্রবেশাধিকারের পরিসর সংকুচিত হলে দেশের উচ্চশিক্ষায় সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।
সংকটের মূল কারণ: কাঠামো নয়, পরিকল্পনার অভাব
সাত কলেজের অভিজ্ঞতা একটি বড় শিক্ষা দেয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক বা তাৎক্ষণিক চাপ সামলানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। আন্দোলন হলো, সিদ্ধান্ত হলো। নতুন দাবি উঠল, আবার সিদ্ধান্ত বদলালো। কিন্তু কোনো বড় সিদ্ধান্তের আগে পর্যাপ্ত গবেষণা, সম্ভাব্যতা যাচাই, অংশীজনদের মতামত এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ছিল কি?
সাত কলেজের মতো বিপুল শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে কাজ করার আগে অন্তত কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর থাকা জরুরি ছিল
– নতুন কাঠামোর আর্থিক উৎস কী?
– প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও প্রশাসনিক জনবল কোথা থেকে আসবে?
– পরীক্ষা ও ফলাফল ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কতটা?
– বর্তমান শিক্ষার্থীদের ট্রানজিশন কীভাবে হবে?
– শিক্ষকদের চাকরির নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে?
– উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি পর্যায়ের বর্তমান কাঠামোর ভবিষ্যৎ কী?
– নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
এই প্রশ্নগুলোর পরিষ্কার উত্তর ছাড়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা মানে পুরোনো সমস্যার ওপর নতুন সাইনবোর্ড বসানো।
শিক্ষার্থীদের জীবন কোনো পরীক্ষাগার নয়
সাত কলেজের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো এখানে প্রশাসনিক ব্যর্থতার মূল্য দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। একটি ভুল সিদ্ধান্তের কারণে তাদের শিক্ষা জীবন দীর্ঘ হয়েছে, চাকরির বাজারে প্রবেশ বিলম্বিত হয়েছে এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্র যখন শিক্ষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, তখন তার ফলাফল কোনো ফাইলে আটকে থাকে না; তা সরাসরি প্রভাব ফেলে একজন তরুণের জীবনে।
একটি সেশনজট শুধু এক বছর নষ্ট হওয়া নয়। এর অর্থ চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা কমে যাওয়া, পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ বৃদ্ধি, মানসিক অনিশ্চয়তা এবং কর্মজীবনে পিছিয়ে পড়া।
তাই সাত কলেজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত কোন কাঠামো শিক্ষার্থীর জন্য সবচেয়ে কার্যকর? কোন কাঠামো রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক বা প্রশাসনিকভাবে সহজ সেটি নয়।
এখন দরকার একটি জাতীয় রোডম্যাপ
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি সফল করতে হলে শুধু আইন পাস করলেই চলবে না। প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য রোডম্যাপ।
প্রথমত, বর্তমান শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা রাখা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষক ও কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক অবস্থান লিখিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, কলেজগুলোর ঐতিহ্য ও বর্তমান কার্যক্রম রক্ষা করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা স্পষ্ট করতে হবে।
চতুর্থত, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা, ফলাফল, একাডেমিক প্রশাসন ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তাড়াহুড়ো করে নতুন দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, এবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কলেজ প্রশাসন, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বাস্তব আলোচনার মাধ্যমে।
পরিশেষে বলা যায় ঢাকার সাত কলেজের সংকট আসলে সাতটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা পরিকল্পনার একটি বড় পরীক্ষা।
২০১৭ সালের সিদ্ধান্ত যদি প্রত্যাশিত ফল না দিয়ে থাকে, তাহলে ২০২৬ সালে একই ধরনের আরেকটি কাঠামোগত পরিবর্তনের আগে অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্যই সমাধান হতে পারে কিন্তু কেবল তখনই, যখন সেটি গবেষণা, সক্ষমতা, অর্থায়ন, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর দাঁড়াবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বদলানো সহজ। কিন্তু একটি শিক্ষার্থীর নষ্ট হয়ে যাওয়া বছর ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।
সাত কলেজের ভবিষ্যৎ তাই আর কোনো প্রশাসনিক ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ হওয়া উচিত নয়। এবার প্রয়োজন এমন একটি স্থায়ী সমাধান, যার কেন্দ্রে থাকবে প্রতিষ্ঠান নয় ‘শিক্ষার্থী এবং তার ভবিষ্যত।
মিজান মাজনুন
সাংবাদিক ও আইনজীবী

