দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা প্রায় দুই কোটি শিশুর একটি বড় অংশ বয়স অনুযায়ী প্রত্যাশিত পড়া, লেখা ও গণিতের দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। বিশ্বব্যাংকের একটি পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, দশ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই তাদের শ্রেণী উপযোগী সহজ বাংলা বা ইংরেজি লেখা পড়ে বুঝতে পারে না। এই চিত্র দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক মানের ক্ষেত্রে একটি গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত সারা দেশে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই কোটির বেশি। এত বিপুলসংখ্যক শিশুকে বিদ্যালয়মুখী করতে পারাটা নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন, আর এই দিক থেকে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা কাঠামো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ব্যবস্থাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। শহর এলাকা থেকে শুরু করে নদীর চর, হাওর অঞ্চল, পাহাড়ি জনপদ ও উপকূলীয় এলাকা পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া গেছে। কিন্তু এই বিস্তৃতির পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন মূল উদ্বেগের বিষয়।
বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই দশকে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় সবার জন্য সুযোগ তৈরি, ঝরে পড়ার হার কমানো এবং ছেলে-মেয়ের মধ্যে সমতা আনার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক সাফল্য দেখিয়েছে। তবে এই অগ্রগতির বিপরীতে শিক্ষার্থীরা প্রকৃতপক্ষে কতটা শিখছে, সেই প্রশ্নে ফল খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে সোয়া লাখের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী পড়ে সরকারি বিদ্যালয়ে। তবে এই হিসাবের মধ্যে কওমি ধারার শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
শিক্ষাক্ষেত্রের এই শিখন ঘাটতির পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের মান দুর্বল হওয়া, বিদ্যালয় পরিচালনায় নেতৃত্বের অভাব, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত বিঘ্ন এবং শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকা—এসব বিষয় একসঙ্গে মিলে শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা অর্জনের পথে বাধা তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই মৌলিক দক্ষতাগুলো ভবিষ্যতে উচ্চতর শিক্ষা এবং কর্মজীবনে প্রবেশের জন্য অপরিহার্য, তাই এই ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।
শিক্ষকদের সংগঠনের একজন শীর্ষ নেতা জানান, করোনা মহামারীর সময় প্রায় দুই বছর বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের শিখন ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি। তার মতে, ঘাটতি পূরণে নানা পরিকল্পনার কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কার্যকারিতা খুবই সীমিত থেকে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মহামারী-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি অমনোযোগ বেড়ে যাওয়া এবং শিক্ষকদের একটি বড় অংশের মধ্যে পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অসন্তোষ। বেতন-ভাতা ও কর্মপরিবেশ তুলনামূলক পিছিয়ে থাকায় মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে আগ্রহী হচ্ছেন না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে এই পরিস্থিতি সরাসরি প্রভাব ফেলছে শ্রেণীকক্ষের পাঠদানের মানে, আর এ থেকে উত্তরণে দরকার দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সরকারি পরিকল্পনা, যাতে শিক্ষকতা পেশা তুলনামূলক আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
জাতীয় পর্যায়ের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ ও একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী দক্ষতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের একটি বড় অংশ এখনো পিছিয়ে। জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষকদের বড় অংশ নিজেদের দক্ষ বলে দাবি করলেও, প্রকৃত শ্রেণীকক্ষে সেই দক্ষতা প্রয়োগ করতে পারছেন মাত্র সামান্য একটি অংশ। দেশের আটটি বিভাগের একাধিক উপজেলার হাজারো শিক্ষকের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র উঠে আসে।
জনবল সংকটও একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে প্রধান শিক্ষকের পদের একটি বড় অংশ—প্রায় চল্লিশ শতাংশ—শূন্য রয়েছে, আর এসব পদে সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি হাজার হাজার প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরুর কথা জানানো হয়েছে, যা এই ঘাটতি কিছুটা হলেও কমাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের চিত্রও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নে নতুন একটি বড় বহুমুখী কর্মসূচি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, যার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে চল্লিশ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর একটি বড় অংশ সরকারি তহবিল থেকে আসবে, বাকিটা আসবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার অনুদান থেকে। প্রস্তাবিত এই কর্মসূচির লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীদের পোশাক ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ, শিক্ষকদের প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল যন্ত্র সরবরাহ, পরিবেশবান্ধব বিদ্যালয় গড়ে তোলার উদ্যোগে গাছ লাগানো, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণীকক্ষ তৈরি, নতুন শ্রেণীকক্ষ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নির্মাণ এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক পড়া-লেখা ও গণনা দক্ষতা নিশ্চিত করার একটি বিশেষ কর্মসূচি।
তবে শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা প্রযুক্তি সরবরাহ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ঢাকার একজন শিক্ষা বিশেষজ্ঞের মতে, দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক নিশ্চিত করা এবং শ্রেণীকক্ষে যথাযথ পাঠদান ও তদারকি ছাড়া কোনো প্রযুক্তিগত উদ্যোগই কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। তার পরামর্শ, শিক্ষকদের জন্য একটি আলাদা ও সম্মানজনক কাঠামো তৈরি করা দরকার, যাতে মেধাবীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহী হন। পাশাপাশি পাঠ্যক্রম সংস্কারের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি, যাতে অতীতের মতো প্রকল্পগুলো শুধু ভবন নির্মাণেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকৃত শিক্ষার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
সরকারি পর্যায়ে পরিচালিত জাতীয় মূল্যায়ন প্রতিবেদনগুলোতেও একই চিত্র বারবার উঠে এসেছে। সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলা ও গণিতে প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জনের হার সন্তোষজনক পর্যায়ে নেই। আগের দশকের তুলনামূলক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিপুল অর্থ ব্যয় সত্ত্বেও কিছু ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের হার বরং কমেছে। একজন সাবেক নীতিনির্ধারক ও শিক্ষা আন্দোলনের একজন সংগঠক মন্তব্য করেন, করোনা মহামারীর ধাক্কা থেকে শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি, আর সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাঙ্গনে সৃষ্ট অস্থিরতাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। তার মতে, শুধু পাঠ্যক্রম বদলালেই হবে না—শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক পরিচালনা ও কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে যেতে হবে, আর এ জন্য একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সংশ্লিষ্ট একজন উপদেষ্টা জানান, দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রভাব শিক্ষা খাতেও পড়েছিল, তাই আনন্দের সঙ্গে শেখার একটি নতুন পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় প্রতিটি শিক্ষককে ডিজিটাল যন্ত্র দিয়ে প্রশিক্ষিত করে তোলার পাশাপাশি ছবি, ভিডিও ও গানের মতো আকর্ষণীয় মাধ্যম ব্যবহার করে পাঠদানের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে এবং বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণীকক্ষ গড়ে তোলা হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে লাখো শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে সারা দেশে একটি ফুটবল আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে, আর চতুর্থ শ্রেণী থেকে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিবিষয়ক পাঠ্যবই যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। তার ভাষ্য, আগামী দিনে শিক্ষা কার্যক্রমকে আরো সৃজনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আকর্ষণীয় করে তোলার লক্ষ্যে কাজ চলছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিপুলসংখ্যক শিশুকে বিদ্যালয়মুখী করার সাফল্য যতটা বাস্তব, শ্রেণী উপযোগী প্রকৃত শিখন নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জও ততটাই গভীর। অবকাঠামো নির্মাণ বা প্রযুক্তি সরবরাহের বাইরে গিয়ে দক্ষ শিক্ষক তৈরি, কার্যকর তদারকি ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে না পারলে আগামী দিনেও এই শিখন সংকট অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

