দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান নিয়ে সরকারি এক পর্যবেক্ষণেই উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। সদ্য প্রকাশিত এক পরিদর্শন প্রতিবেদন বলছে, দেশের অধিকাংশ স্কুলে শিক্ষকেরা যে উপকরণ ব্যবহার করে পড়াচ্ছেন, তার সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুর মিল নেই বললেই চলে। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রকৃতপক্ষে কতটুকু শিখছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে শিক্ষাবিদদের মনে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর—সংক্ষেপে মাউশি—প্রতি তিন মাস অন্তর দেশের স্কুলগুলোর শ্রেণিকক্ষ কার্যক্রম যাচাই করে থাকে। এবারের প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসের তথ্যের ভিত্তিতে। এই সময়ে সারা দেশে সাড়ে পাঁচ হাজারের কাছাকাছি স্কুল পরিদর্শন করা হয়, যার মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৭৪৭টি প্রতিষ্ঠানে সরাসরি শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম খতিয়ে দেখেন পরিদর্শকেরা।
ফলাফলে দেখা যায়, এই স্কুলগুলোর প্রায় ৫৭ শতাংশেই শিক্ষকদের ব্যবহৃত শিখন উপকরণ পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। সংখ্যার হিসাবে বললে, প্রায় দেড় হাজারের বেশি স্কুলে এই গরমিল ধরা পড়েছে, আর মাত্র ১ হাজার ১৯০টির মতো স্কুলে উপকরণ পাঠের সঙ্গে ঠিকমতো মিলছে।
মজার বিষয় হলো, বেশিরভাগ স্কুলেই কোনো না কোনো শিক্ষা উপকরণ আছে—একেবারে খালি হাতে ক্লাস নেওয়ার চিত্র খুব একটা নেই। সমস্যাটা মূলত উপকরণের প্রাপ্যতায় নয়, বরং তার সঠিক ও যথাযথ ব্যবহারে।
এই অসামঞ্জস্যের চিত্র সব অঞ্চলে সমান নয়। ঢাকা অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি, ৩২১টি স্কুলে এই সমস্যা মিলেছে। এরপরের অবস্থানে আছে ময়মনসিংহ (২৪৯), খুলনা (১৯৪), রংপুর (১৯৩), বরিশাল (১৫৩), চট্টগ্রাম (১৩৫), রাজশাহী (১৩২), কুমিল্লা (১১১) এবং সবচেয়ে কম সিলেটে, ৬৯টি স্কুলে।
একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে খুলনা অঞ্চলের ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপার একটি বিদ্যালয়ের কথা। সেখানে নবম শ্রেণির কৃষিশিক্ষা ক্লাস পরিদর্শনের সময় দেখা গেছে, পাঠোপযোগী উপকরণ তো দূরের কথা, ন্যূনতম প্রয়োজনীয় কোনো সরঞ্জামই শ্রেণিকক্ষে ছিল না—এমনকি বিনা মূল্যে সংগ্রহযোগ্য সাধারণ উপকরণও চোখে পড়েনি।
শুধু উপকরণ নয়, শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক অগ্রগতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও বড় দুর্বলতা ধরা পড়েছে এই জরিপে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৫২ শতাংশ স্কুলে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মূল্যায়নের তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষিত হয় না। আবার প্রায় ২৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী পাঠদানই হয় না।
শিক্ষাবিদদের ভাষ্য, এই দুর্বলতার ফল সুদূরপ্রসারী। কোনো শিক্ষার্থী একটি বিষয়ে পিছিয়ে থাকলে তা সময়মতো ধরা না পড়লে সেই ঘাটতি পরের শ্রেণিতেও বয়ে বেড়াতে হয়, যা একসময় পুষিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যার শিকড় অনেকটাই জড়িয়ে আছে শিক্ষকসংকটের সঙ্গে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে এই সংকট সবচেয়ে প্রকট। মাউশির হিসাব অনুযায়ী, দেশে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা ৭০২টি, যেখানে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ প্রায় ১৫ হাজার ৩০০টি। এর মধ্যে তিন হাজারের বেশি পদ খালি পড়ে আছে, আর প্রধান শিক্ষকের পদও শূন্য প্রায় ৩৮৩টি।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ের শিক্ষক–সংকট। বিষয়টি বাধ্যতামূলক করার এক যুগেরও বেশি সময় পার হলেও এখনো আলাদা শিক্ষক পদ তৈরি হয়নি; গণিত বা বিজ্ঞানের শিক্ষকদের বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে এই ক্লাস নিতে হচ্ছে। একজন শিক্ষককে যখন একাধিক বিষয়ে, একাধিক শ্রেণিতে ক্লাস নিতে হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই পাঠ প্রস্তুতি বা উপযুক্ত উপকরণ বেছে নেওয়ার মতো সময় কমে আসে।
তিন মাসের এই পর্যবেক্ষণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা প্রসঙ্গেও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। এই সময়ে বিভিন্ন স্কুল থেকে মোট ৭১টি যৌন হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার একটি উচ্চবিদ্যালয় থেকে—একাই ১২টি। এ ছাড়া ময়মনসিংহের গৌরীপুর, নারায়ণগঞ্জ সদর, বগুড়ার দুপচাঁচিয়া ও টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের কয়েকটি বিদ্যালয় থেকেও একাধিক অভিযোগ এসেছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোয় সংখ্যা তুলনামূলক কম, এক থেকে তিনটির মধ্যে।
এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করে চিঠি দেওয়া এবং প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট সংশ্লিষ্ট এক অধ্যাপকের মতে, শুধু উপকরণ থাকলেই চলবে না—তা শিক্ষাক্রমের চাহিদার সঙ্গে কতটা মানানসই এবং সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সেটিও নিয়মিত তদারক করা জরুরি। তাঁর ভাষায়, শিক্ষাক্রমের প্রত্যাশা, উপকরণের নকশা এবং তদারকি—এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে সমন্বয় ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
অন্যদিকে মাউশির শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শিক্ষকদের সঠিক উপকরণ ব্যবহারে সচেতন করতে ইতিমধ্যে বিদ্যালয়গুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে মনিটরিং আরও জোরদার করা হবে। যৌন হয়রানি ঠেকাতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কমিটি সক্রিয় করা ও সচেতনতা বাড়ানোর কথাও বলেছেন তিনি।
বিশ্লেষকদের অভিমত, এই প্রতিবেদন কেবল উপকরণ বা মূল্যায়নের ঘাটতির চিত্র তুলে ধরেনি—এটি একটি বড় কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দেয়। শিক্ষক স্বল্পতা, প্রশিক্ষণের অভাব এবং তদারকির দুর্বলতা—এই তিনটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। কেবল নতুন বই বা উপকরণ সরবরাহ করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন শিক্ষকের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা, তাঁদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সেই প্রশিক্ষণ বাস্তবে কাজে লাগছে কি না, তা নিয়মিত যাচাই করা।
শিক্ষাবিদদের মতে, শ্রেণিকক্ষেই যদি শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়া মজবুত করা যায়, তাহলে বাড়তি কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। অন্যথায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের এই শিখন-ঘাটতি উচ্চশিক্ষা এবং পরবর্তী কর্মজীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তাঁরা।

