আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের পাশাপাশি যথাযথ মর্যাদায় দিনটি উদযাপন করছে বাংলাদেশও। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা এবারের দিবসের জন্য যে প্রতিপাদ্য বেছে নিয়েছে, তাতে সাক্ষরতাকে কেবল পড়া-লেখা-গণনার মৌলিক দক্ষতা হিসেবে না দেখে মানুষের সার্বিক উন্নয়ন, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পৃথক পৃথক বাণী দেওয়া হয়েছে, যা এই বিষয়ের গুরুত্বকেই তুলে ধরে। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে সাক্ষরতার হার সাতাত্তর দশমিক নয় শতাংশ—যা আগের তুলনায় একটি ধারাবাহিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়, যদিও লক্ষ্যমাত্রা থেকে এখনো বেশ খানিকটা দূরে রয়েছে দেশ।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, গত কয়েক দশকে সাক্ষরতা বিস্তারে বাংলাদেশ যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করেছে, যা আশাব্যঞ্জক হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি একটি বাস্তবতাও থেকে যাচ্ছে—দেশের একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী এখনো কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। বিশেষত বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা এবং মাঝপথে ঝরে পড়া শিশু-কিশোর, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষাবঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষদের কথা এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শুধু বর্ণমালা চেনার সীমাবদ্ধ পরিসর ছাড়িয়ে তাদের প্রয়োগিক সাক্ষরতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষার আওতায় আনাই এখন নীতিনির্ধারকদের প্রধান অগ্রাধিকারের বিষয়।
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দেশের সংবিধানেই শিক্ষাকে রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংবিধানের নির্দিষ্ট একটি অনুচ্ছেদে সর্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণের অঙ্গীকার স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এই সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাকে সামনে রেখে বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, জীবনদক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মতো নানামুখী উদ্যোগ হাতে নিয়েছে, যাতে শিক্ষাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে দেশের মূল উন্নয়নধারায় যুক্ত করা যায়।
দিবসটি উপলক্ষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে রাজধানীতে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মিলনায়তনে সকালে একটি আলোচনা সভা ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীর, বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা। পাশাপাশি জাতিসংঘের শিক্ষা সংস্থার প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখবেন। অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করবেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, আর স্বাগত বক্তব্য দেবেন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক। সবশেষে সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটবে।
শুধু কেন্দ্রীয় আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নয়, দেশজুড়ে প্রতিটি জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে আলোচনা সভা ও উদযাপনের বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। উপজেলা পর্যায়েও ছোট পরিসরে আলোচনা সভা, সচেতনতামূলক র্যালি ও অন্যান্য কর্মসূচি আয়োজিত হবে। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোও নিজেদের মতো করে দিবসটি পালনের উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে ঊনিশশ সাতষট্টি সালে ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা। এরপর থেকে প্রতি বছর এই দিনটি সাক্ষরতার গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরি এবং এখনো নিরক্ষরতার সঙ্গে লড়াই করে যাওয়া কোটি কোটি মানুষের সংগ্রামকে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক, তবে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে এই অগ্রগতির আওতায় আনা। কেবল আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সীমানা ছাড়িয়ে কর্মমুখী ও প্রায়োগিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে পারলেই দেশের সার্বিক সাক্ষরতা কার্যক্রম প্রকৃত অর্থে সফল হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

