শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন ও শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া ১৫ দফা অনুশাসন বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে শিক্ষা প্রশাসন। গত ২৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে একটি পর্যালোচনা সভায় এই ১৫ দফা নির্দেশনা দেন এবং ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ‘রেকর্ড অব নোটস’ ও কার্যবিবরণী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। সেই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আচরণবিধি প্রণয়ন, শ্রেণিকক্ষে অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন বাস্তবায়ন, শিক্ষকদের পাঠদানের লাইভ মনিটরিং, সহশিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং একটি ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ চালুর বিষয়ে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো শিক্ষকদের আচরণবিধি প্রণয়ন। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য এই বিধিমালা তৈরি হচ্ছে, যেখানে শিক্ষকরা কী করতে পারবেন এবং কী করতে পারবেন না, তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেছেন, ‘শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া অনুশাসনগুলো বাস্তবায়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ইতোমধ্যেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’ ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘বিগত দিনে দেখা গেছে শিক্ষকরা ক্লাসরুমে পাঠদানের চেয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মনোযোগী হয়েছেন বেশি। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষকদের রাজনীতিমুক্ত রাখা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার এখন সময়ের দাবি।’
প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান তদারকির কাজও শুরু হয়েছে। মাউশির সহকারী পরিচালকরা ‘ডিএমএস অ্যাপ’-এর মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান সরাসরি লাইভ ভিডিও কলে মনিটরিং করবেন। এ জন্য প্রধান শিক্ষকদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর পিডিএস-এ আপডেট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মাউশি জানিয়েছে, শুধু তাই নয়, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চলতি সেপ্টেম্বর থেকে এআই ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষক প্রশিক্ষণ শুরু হচ্ছে। আইসিটি প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যেই ৩ লাখ ৫ হাজার ২৮৮ জন শিক্ষক-কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দক্ষ শিক্ষকদের নিয়ে ‘মাস্টার ট্রেইনার পুল’ ও ‘টিচার্স এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম’ চালুর পাশাপাশি এনসিটিবি’র সঙ্গে সমন্বয় করে অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে।
সহশিক্ষা কার্যক্রমে বড় পরিবর্তন আসছে। মাউশির শারীরিক শিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সারা বছর ১৫ ধরনের খেলাধুলা এবং ২১ ধরনের সহ-পাঠ্যক্রমিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। খেলাধুলার মধ্যে রয়েছে ফুটবল, ভলিবল, দাবা, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও মার্শাল আর্ট। পাশাপাশি বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, দেয়ালিকা তৈরি, বই পড়া, সৃজনশীল লেখা, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ও গণিত অলিম্পিয়াডের মতো কার্যক্রমও চালু থাকবে। সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে সংগীত, কবিতা আবৃত্তি, নৃত্য, চিত্রাঙ্কন এবং উৎসব ও লোকসংস্কৃতিবিষয়ক অনুষ্ঠান। মাউশি বলছে, এসব কার্যক্রম একাডেমিক শিক্ষার পরিপূরক হিসেবে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় উদ্যোগ হলো ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ চালুর প্রস্তুতি। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা যেন সেরা শিক্ষকদের ক্লাস গ্রহণের সুযোগ পায়, সে লক্ষ্যে সংসদ টিভির প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি ডেডিকেটেড শিক্ষা চ্যানেল চালুর খসড়া কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও শিক্ষার জন্য পৃথক চ্যানেল চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক ঘাটতি মেটাতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে নতুন ক্যাটাগরিতে শিক্ষকদের ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পদক ও পুরস্কার প্রদানের পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে।
মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ১৫ দফা অনুশাসন মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে অত্যন্ত দিকনির্দেশনামূলক। সম্প্রতি আমরা একটি বৈঠক করে প্রতিটি উইংকে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে কাজ ভাগ করে দিয়েছি। শিক্ষকদের এআই প্রশিক্ষণ, অ্যাপভিত্তিক লাইভ মনিটরিং ও জাতীয় শিক্ষা চ্যানেলের প্রস্তুতি দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।’ অনুশাসন বাস্তবায়ন তদারকির ফোকাল পার্সন ও মাউশির উপপরিচালক মো. শওকত হোসেন মোল্ল্যা জানিয়েছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাগুলো শতভাগ বাস্তবায়নে নিবিড় মনিটরিং নিশ্চিত করা হচ্ছে। কোন প্রতিষ্ঠান কীভাবে কাজ করছে, তা সরাসরি তদারকি করা হচ্ছে।’ শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার চিত্র বদলে যাবে, শিক্ষার্থীরা ফিরবে শ্রেণিকক্ষে, শিক্ষকরা ফিরবেন পাঠদানে। তবে সবকিছুর মূল চাবিকাঠি হলো বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা এবং মাঠপর্যায়ে নিবিড় মনিটরিং।

