ফরিদপুরের বোয়ালমারী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান চলছে মাত্র তিনজন নিয়মিত শিক্ষকের ওপর ভর করে। তাঁদের একজন আবার বিএড প্রশিক্ষণে আছেন। বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষক পদ ১২টি, যার ৯টিই শূন্য। বাধ্য হয়ে চারজন খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে কোনোমতে ক্লাস চালানো হচ্ছে। এতে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ।
বিদ্যালয় সূত্র জানায়, উপজেলা সদরের দক্ষিণ শিবপুর মহল্লার এই প্রতিষ্ঠান ১৯৬৫ সালে যাত্রা শুরু করে। ১৯৮৭ সালের শেষ দিকে এটি জাতীয়করণ হয়। তখন প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ছিল ১১টি। পরে আইসিটি বিষয়ে আরেকটি পদ যুক্ত হওয়ায় মোট পদ দাঁড়ায় ১২টিতে।
বর্তমানে নিয়মিত শিক্ষক বলতে আছেন প্রধান শিক্ষক এবং শরীরচর্চা ও ক্রীড়া শিক্ষক। এর মধ্যে ইংরেজি বিষয়ের একজন শিক্ষক প্রশিক্ষণে থাকায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি, বাংলা ও ধর্ম বিষয়ে সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য পড়ে আছে। অর্থাৎ শিক্ষাক্রমের মূল বিষয়গুলোতেই স্থায়ী শিক্ষকের অভাব রয়েছে।
শুধু শিক্ষক নয়, কর্মচারীর সংকটও প্রকট। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চারটি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কাজ করছেন মাত্র একজন নৈশপ্রহরী। ২০১৫ সাল থেকে অফিস সহকারীর পদ এবং ২০২১ সাল থেকে দপ্তরির পদ শূন্য। আয়া বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী নেই একজনও।
বিদ্যালয় সূত্র আরও জানায়, জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার সমন্বিত কেন্দ্র হিসেবে নির্মিত একটি ছয়তলা ভবনে এখন পাঠদান চলছে। অন্য ভবনগুলো বোর্ড পরীক্ষার সময় ব্যবহার হলেও বছরের বাকি সময় পরিত্যক্ত থাকে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় ভবন ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েকটি শৌচাগারের অবস্থাও নাজুক বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
একসময় নারীশিক্ষায় সুনাম থাকা এই প্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ছে পাঁচ শতাধিক ছাত্রী। শিক্ষকসংকটে তাদের পড়াশোনা নিয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী অনিকা সরকার জানায়, শিক্ষক না থাকায় উচ্চতর গণিতের ক্লাস নিয়মিত হয় না। বিজ্ঞানাগার থাকলেও দীর্ঘদিন সেখানে ব্যবহারিক ক্লাস হচ্ছে না। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসনিম মৃধা বলে, নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় ঘাটতি পূরণে তাকে বাইরে প্রাইভেট পড়তে হচ্ছে।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতির অভিভাবক আব্দুল গফফার মোল্যা বলেন, শিক্ষকসংকট দ্রুত দূর করা দরকার। তাঁর মতে, এই সংকটের কারণে সন্তানদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেওয়া যায় না।
খণ্ডকালীন শিক্ষক বিউটি পারভীন জানান, পুরো মাস পড়ানোর পর বিদ্যালয় থেকে যে সম্মানী দেওয়া হয়, তা খুবই সামান্য। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে এই অঙ্ক একেবারেই অপ্রতুল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শরীরচর্চা ও ক্রীড়া শিক্ষক মাসুদুল ইসলাম বলেন, ১২ জনের কাজ সামলাতে চার খণ্ডকালীন শিক্ষক, তিনি ও প্রধান শিক্ষক—মোট ছয়জনকে প্রতিদিন একাধিক পিরিয়ড নিতে হচ্ছে। একটি ক্লাস শেষ করেই আরেকটিতে ছুটতে হয়। ফলে পাঠদানের প্রস্তুতির সময় মেলে না, আর কাঙ্ক্ষিত মানের পড়ানোও সম্ভব হয় না।
প্রধান শিক্ষক সুকান্ত চন্দ্র মণ্ডল জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যোগদানের পরই তিনি শিক্ষক-কর্মচারী সংকটের কথা লিখিতভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ঢাকা অঞ্চলের উপপরিচালককে জানিয়েছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও বিষয়টি অবহিত করেছেন। কিন্তু এখনো কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। সরকারি বরাদ্দ না থাকায় স্থানীয়ভাবে তহবিল তুলে খণ্ডকালীন শিক্ষকদের সামান্য সম্মানী দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত শূন্য পদে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম রকিবুল হাসান বলেন, বিষয়টি জানার পর তিনি সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরকে অবহিত করেছেন। সংকট নিরসনে তাঁর চেষ্টা অব্যাহত আছে। তিনি আশা করছেন, শিগগিরই শূন্য পদে শিক্ষক দেওয়া হবে এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে।
এই সংকট কেবল একটি বিদ্যালয়ের সমস্যা হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। এর পেছনে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধীরগতি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার চিত্র স্পষ্ট।
প্রথমত, অনুপাতের প্রশ্ন। অনুমোদিত পদের তিন-চতুর্থাংশ শূন্য থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠানেই মানসম্মত পাঠদান সম্ভব নয়। পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য তিনজন নিয়মিত শিক্ষক, তাও একজন প্রশিক্ষণে। কার্যত এই বিদ্যালয় চলছে খণ্ডকালীন শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করে।
দ্বিতীয়ত, খণ্ডকালীন শিক্ষকনির্ভর ব্যবস্থার ঝুঁকি। সরকারি বরাদ্দ ছাড়া স্থানীয় তহবিলে সামান্য সম্মানী দিয়ে শিক্ষক ধরে রাখা টেকসই নয়। সম্মানী কম হলে দক্ষ শিক্ষক থাকতে চাইবেন না। তখন সংকট আরও গভীর হবে।
তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব। উচ্চতর গণিত ও বিজ্ঞানের ব্যবহারিক ক্লাস নিয়মিত না হলে ভবিষ্যতে এসএসসি ও উচ্চশিক্ষায় তারা পিছিয়ে পড়বে। বাধ্য হয়ে প্রাইভেট পড়তে হলে অভিভাবকদের খরচও বাড়ে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা। নারীশিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যের সঙ্গেও এটি সাংঘর্ষিক।
চতুর্থত, সাড়া না মেলার প্রশ্ন। প্রধান শিক্ষক ফেব্রুয়ারি থেকে লিখিতভাবে একাধিক দপ্তরকে জানালেও আট মাসেও ফল আসেনি। এতে স্পষ্ট, জানানোর ব্যবস্থা থাকলেও সমাধানের কার্যকর প্রক্রিয়া নেই। উপজেলা প্রশাসনের আশ্বাস ইতিবাচক হলেও নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা তাদের হাতে নেই।
পঞ্চমত, অবকাঠামো ও কর্মচারী সংকট। ছয়তলা ভবন থাকলেও পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও দপ্তরি না থাকায় শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। কিছু শৌচাগারের নাজুক অবস্থা ছাত্রীদের জন্য স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ, সাময়িকভাবে সরকারি বরাদ্দে অতিথি শিক্ষকদের সম্মানী নিশ্চিত করা এবং কর্মচারী পদ পূরণ এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই বিদ্যালয়ের সুনাম ও শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চয়তায় পড়বে।

