প্রাথমিক শিক্ষার মান ও স্কুলের পরিবেশ উন্নয়নে ৪১ হাজার ৯০ কোটি টাকার পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদন দিয়েছে সরকার। গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়। পাঁচ বছর মেয়াদি এ কর্মসূচির আওতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে পোশাক, জুতা, মোজা ও ব্যাগ পাবে। শিক্ষকদের জন্য থাকছে ট্যাব ও প্রশিক্ষণ।
কর্মসূচিটি চলবে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত। এর আওতায় একদিকে শিক্ষার্থীদের সরাসরি সুবিধা দেওয়া হবে, অন্যদিকে স্কুলের অবকাঠামো ও শিক্ষাদানের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হবে। প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে ডিজিটাল শিক্ষার উপযোগী কাঠামো গড়ে তোলা, নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ এবং শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোই এর মূল লক্ষ্য। কর্মসূচির মোট বরাদ্দের প্রায় ৫৭ শতাংশ ব্যয় হবে শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম, ডিজিটাল শিক্ষা ও প্রয়োজনভিত্তিক শ্রেণিকক্ষ তৈরিতে।
মোট বরাদ্দের ২৫ দশমিক ২ শতাংশ খরচ হবে শিক্ষার্থীদের জন্য। এ অর্থে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২ শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে স্কুলের পোশাক, ব্যাগ, জুতা ও মোজা দেওয়া হবে।
সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও ডিজিটাল শিক্ষা সম্প্রসারণের নীতির সঙ্গে মিল রেখে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার জন্যও বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ খাতে মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৯ শতাংশ ব্যয় হবে। ‘এক শিক্ষক, এক ট্যাব’ উদ্যোগের আওতায় শিক্ষকদের মধ্যে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৫১৩টি ট্যাব বিতরণ করা হবে। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে মাল্টিমিডিয়া ও ইন্টারঅ্যাকটিভ ফ্ল্যাট প্যানেল (আইএফপি) বসানো হবে। এ জন্য ২০ হাজার ইন্টারঅ্যাকটিভ প্যানেল প্রজেক্টর দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দূর করতে মোট বরাদ্দের ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যয় হবে। এ অর্থে প্রয়োজন অনুযায়ী ১৫ হাজার ৬৪১টি শ্রেণিকক্ষ, ১ হাজার ৫০০টি ওয়াশ ব্লক এবং ১০ হাজার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হবে।
শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক পড়া ও গণিতের দক্ষতা বাড়াতে এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের পেশাগত সক্ষমতা উন্নয়নে আরও ৭ দশমিক ৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ অর্থে ৩ লাখ ১০ হাজার শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের ভিত্তিমূলক পড়া ও গণিতের দক্ষতা (ফাউন্ডেশনাল লিটারেসি অ্যান্ড নিউমেরেসি) এবং শিক্ষকদের পেশাগত সক্ষমতা জোরদার করা।
কর্মসূচির মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে ৩৩ হাজার ২০৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। বাকি ৭ হাজার ৮৮৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা আসবে বিদেশি ঋণ ও অনুদান থেকে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ইউনিসেফসহ উন্নয়ন সহযোগীরা এ কর্মসূচিতে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
কর্মসূচির অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং সুবিধা ও ব্যয়ের অনুপাত ২ দশমিক ৭। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দীর্ঘ মেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এ কর্মসূচি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
একই সভায় মোট ৫৮ হাজার ৮৮৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ের ১৩টি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে ১১টি নতুন এবং দুটি সংশোধিত প্রকল্প। এর মধ্যে পুলিশের জন্য যানবাহন কেনার দুটি প্রকল্পও রয়েছে। দেশের ৬৩৯টি থানায় যানবাহনের ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশ পুলিশের জন্য ৫ হাজার ৮৩০টি গাড়ি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। বর্তমানে প্রতিটি থানায় গড়ে দুটি গাড়িরও কম আছে।
এ জন্য নেওয়া দুটি প্রকল্পের একটিতে ৪ হাজার ৮২৯টি সাধারণ ব্যবহারের গাড়ি কেনা হবে, যার ব্যয় ৪ হাজার ৩২৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অন্যটিতে ১ হাজার ১টি বিশেষায়িত গাড়ি কেনা হবে, যার ব্যয় ২ হাজার ২৮০ কোটি ১০ লাখ টাকা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ১ কোটির বেশি শিক্ষার্থী সরাসরি সুবিধা পাবে এবং স্কুলগুলোর অবকাঠামোগত ঘাটতিও কিছুটা কমবে। তবে পাঁচ বছরের এই বিশাল কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে সময়মতো বাস্তবায়ন, উপকরণের মান এবং অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতার ওপর। বিশেষ করে ট্যাব ও ডিজিটাল সরঞ্জাম শ্রেণিকক্ষে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়, তা-ও নজরে থাকবে।

