ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির অনুসন্ধানে দেশের ২০টির বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে।
বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থাটি বলেছে, রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে কাউকে শাস্তি দেওয়া এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ব্যবস্থা নেওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে স্বীকৃত মতপ্রকাশ ও সংগঠন করার স্বাধীনতার পরিপন্থী।
এইচআরডব্লিউর মতে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের পদক্ষেপ অতীতের সরকারগুলোর অনুসৃত দমনমূলক ব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি। সংস্থাটি মনে করে, রাজনৈতিক পরিচয় বা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক বিতর্কের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এ ধরনের আলোচনা নিয়ে ভয় পাওয়ার কথা শুধু স্বৈরশাসকদের, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গঠিত কোনো সরকারের নয়।”
তিনি আরও বলেন, “অতীতের দমন-পীড়নের অধ্যায় পেছনে ফেলে বাংলাদেশের সামনে এগিয়ে যাওয়া উচিত। ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদলের অবস্থান বদল হলেই যেন আগের দমন-পীড়নের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।”
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যেসব ব্যবস্থা
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এসব ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে চাকরিচ্যুত করা, সাময়িক বরখাস্ত এবং পাঠদান থেকে বিরত রাখা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের পক্ষে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা এবং ইসলামি পোশাক পরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সদস্য বা সমর্থক বলে অভিযোগ রয়েছে, এমন শত শত শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে তাঁরা উচ্চশিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে বহিষ্কার, পরীক্ষার সনদ বাতিল এবং শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ঘটনাও জানতে পেরেছে এইচআরডব্লিউ।
এসব ঘটনার সত্যতা ও ধরন যাচাই করতে শাস্তির মুখে পড়া কয়েকজন শিক্ষকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আদান-প্রদান করা চিঠিপত্র পর্যালোচনা করেছে। এ ছাড়া টেলিভিশনে প্রচারিত একটি আলোচনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও বিশ্লেষণ করেছে।
অনুসন্ধানে দেশের ২০টির বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের শাস্তিমূলক পদক্ষেপের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার আহ্বান
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “আগের সরকারকে সমর্থন করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা প্রমাণ করবে, এ দেশে মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত নয়।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়েও মন্তব্য করেন তিনি।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত এমন জায়গা, যেখানে সবাই স্বাধীনভাবে নিজেদের মতপ্রকাশ করতে পারবেন। সেখানে বর্তমান সরকারকে সমর্থন করতে কাউকে বাধ্য করা উচিত নয়।”
এইচআরডব্লিউর বক্তব্যে মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষার অধিকার এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। সংস্থাটির মতে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আগের সরকারের দমনমূলক চর্চার পুনরাবৃত্তি হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন মতবিনিময়ের পরিবেশ হারাবে।
সূত্র: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ), বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদন

