চার বছরের স্নাতক কিংবা আরও এক বছরের স্নাতকোত্তর শেষ করে একজন শিক্ষার্থীর জীবনে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তগুলোর একটি হলো সমাবর্তন। কালো গাউন, মাথায় টুপি আর সহপাঠীদের সঙ্গে সেই স্মরণীয় ছবি—শিক্ষাজীবনের এই শেষ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকেন প্রায় সব গ্র্যাজুয়েট।
কিন্তু বাংলাদেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সেই অপেক্ষা বছরের পর বছর ধরে চলছে। কেউ বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছেন এক দশকেরও বেশি আগে, কেউ চাকরিতে যোগ দিয়েছেন, কেউ বিদেশে উচ্চশিক্ষায় পাড়ি জমিয়েছেন; তবু এখনো তারা পাননি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সেই আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির মুহূর্ত।
দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজারো গ্র্যাজুয়েটের এই অপেক্ষা কখনো ১৮ বছর, কখনো ১৭ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হয়েছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠার পর একবারও সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়নি। আবার কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম সমাবর্তনের পর দ্বিতীয়টির জন্য অপেক্ষা চলছে বহু বছর ধরে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৫৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত একবার সমাবর্তন আয়োজন করেছে ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়। বাকি ২৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো কোনো সমাবর্তন হয়নি। যদিও এর মধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি।
মাত্র একটি সমাবর্তন আয়োজন করেছে এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও কম নয়। অন্যদিকে তিনবার বা তার বেশি সমাবর্তন হয়েছে এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র ১০টি।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সমাবর্তন না হওয়া পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে তারা মূল সনদ পান না। এর পরিবর্তে দেওয়া হয় সাময়িক সনদ। কিন্তু এই সাময়িক সনদ নিয়েও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় গ্র্যাজুয়েটদের।
অনেক শিক্ষার্থীর দাবি, সাময়িক সনদে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের স্বাক্ষর না থাকায় চাকরি, উচ্চশিক্ষা কিংবা বিদেশে আবেদনের সময় বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে কোনো প্রতিষ্ঠান মূল সনদ বা সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষরযুক্ত নথি চাইলে সমস্যায় পড়েন তারা।
এ ছাড়া সাময়িক সনদের কাগজের মান নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে অনেকের মধ্যে। শিক্ষার্থীদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক নথি হিসেবে এর মান আরও উন্নত হওয়া প্রয়োজন।
উত্তরবঙ্গের অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখনো প্রথম সমাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে দেড় যুগ পেরিয়ে গেলেও কোনো সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে সমাবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
বেরোবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকত আলী জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন আয়োজনের জন্য কাজ করছে। তবে বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে আগের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৮ বছর পর প্রথম সমাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী বছরের মার্চে প্রথম সমাবর্তন আয়োজনের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও এখন পর্যন্ত কোনো সমাবর্তন হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অর্থসংকটসহ বিভিন্ন কারণে আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
শুধু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরোনো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েও নিয়মিত সমাবর্তনের অভাব রয়েছে। কোথাও প্রথম সমাবর্তন হওয়ার পর দ্বিতীয়টির জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে কয়েক বছর।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পর ২০১৭ সালে প্রথম সমাবর্তন আয়োজন করে। প্রায় এক দশক পর আগামী বছরে দ্বিতীয় সমাবর্তন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ২০২০ সালে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর দ্বিতীয় সমাবর্তন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমাবর্তন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান নয়। এটি একজন শিক্ষার্থীর দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের স্বীকৃতির মুহূর্ত। রাষ্ট্রপতি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের উপস্থিতি, দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং সহপাঠীদের সঙ্গে শেষবারের মতো একত্র হওয়া—সব মিলিয়ে এটি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশেষ স্মৃতি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমাবর্তনকে এখনো অনেক সময় আলাদা একটি অনুষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়। অথচ এটি শিক্ষাজীবনের স্বাভাবিক অংশ হওয়া উচিত।
তার মতে, একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময়ই তার শিক্ষাজীবনের সম্ভাব্য সময়সূচি, সমাপ্তি এবং সমাবর্তনের একটি কাঠামো সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সমাবর্তন শুধু ডিগ্রি বিতরণের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একজন শিক্ষার্থীর অর্জনের স্বীকৃতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের শেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সমাবর্তনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিকল্পনা, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘদিন সমাবর্তন না হলে শুধু একটি অনুষ্ঠান পিছিয়ে যায় না, বরং হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

