চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য নিয়োগ ঘিরে এক মাস ধরে চলা অচলাবস্থায় অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সংকটের কারণ খুঁজে বের করা এবং সমাধানের পথ দেখাতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) তদন্ত বা পরামর্শক কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউজিসি ছয় সদস্যের একটি পরামর্শক কমিটি করেছে। তবে আন্দোলন শুরুর প্রায় এক মাস পর এই উদ্যোগ নেওয়ায় মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ ইউজিসির চেয়ারম্যানকে একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে ইউজিসির সদস্য পর্যায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি গঠন করে চুয়েটের চলমান সংকটের বিস্তারিত অনুসন্ধান করতে বলা হয়। একই সঙ্গে সংকট নিরসনে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে পাঠাতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে সই করেছেন বিভাগের সহকারী সচিব মো. সুলতান আহমেদ। তিনি চিঠি পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মন্ত্রণালয়ের চিঠির পর গতকাল সোমবার অচলাবস্থা কাটিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম আবার চালুর লক্ষ্যে সুপারিশ দিতে ছয় সদস্যের পরামর্শক কমিটি গঠন করে ইউজিসি। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক আবদুল্লাহ-আল-মামুনকে।
সংকটের শুরু ২১ সেপ্টেম্বর। ওই দিন শিক্ষা মন্ত্রণালয় চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অপসারণ করে তাঁর জায়গায় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দেয়। অধ্যাপক সায়েম ২৭ জুলাই দায়িত্ব নিয়েছিলেন, অর্থাৎ ৫৬ দিনের মাথায় তাঁকে সরে যেতে হয়। সাবেক উপাচার্যকে ফিরিয়ে আনার দাবিতে শিক্ষার্থীরা ২২ সেপ্টেম্বর ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ করে আন্দোলন শুরু করেন। পরে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশও কর্মবিরতি ও অসহযোগ কর্মসূচিতে যোগ দেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
আন্দোলনের চাপে নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে যেতে পারেননি। ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি অনলাইনে যোগদান করেন এবং এরপর চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস থেকে প্রশাসনিক কাজ চালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বিরোধিতায় সংকটের সমাধান হয়নি।
১২ অক্টোবর উপাচার্য ক্যাম্পাসে গিয়ে নিজ কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময় তাঁর সঙ্গে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী ছিলেন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ভবনের ফটকে তালা দিয়ে তাঁকে অবরুদ্ধ করেন। এক পর্যায়ে ভবনের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় বলেও সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। প্রায় ৩০ ঘণ্টা পর ১৩ অক্টোবর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের সহায়তায় তাঁকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে আনা হয়। চিকিৎসা শেষে ১৫ অক্টোবর তিনি আবার সার্কিট হাউসে ফিরে যান।
পরদিন ১৬ অক্টোবর সার্কিট হাউস থেকেই তিনি জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডাকেন। সভাটি হয় অনলাইনে, আর সিন্ডিকেটের ১৬ সদস্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ছয়জন। এটি নতুন বিতর্ক তৈরি করে। উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে ছিলেন উপাচার্য নিজে, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারী, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান এবং চুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রকৌশলী খান আতাউর রহমান। অনুপস্থিত ছিলেন চুয়েটের দুই অনুষদের ডিন, দুই ইনস্টিটিউটের পরিচালক, অধ্যাপকদের দুই প্রতিনিধি, অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক, রেজিস্ট্রার এবং বুয়েট ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন অধ্যাপক। ওই সভাতেই সংকট নিরসনে নিরপেক্ষ ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত বা পরামর্শক কমিটি গঠনের জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশের সিদ্ধান্ত হয়। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগের কথাও বলা হয়।
চুয়েটের ইতিহাসে এত দীর্ঘ অচলাবস্থা আগে কখনো দেখা যায়নি। এই সময়ে ঘটেছে নজিরবিহীন নানা ঘটনা। এর মধ্যে আছে উপাচার্যের অনলাইনে যোগদান, সার্কিট হাউস থেকে প্রশাসন পরিচালনা, ক্যাম্পাসে প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকা, পুলিশের সহায়তায় উদ্ধার এবং অনলাইনে ডাকা সিন্ডিকেট সভা শিক্ষক প্রতিনিধিদের বর্জন করা। ক্ষতির হিসাবও বড়। আন্দোলনে প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বাতিল হয়েছে ৩৩টি সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা এবং বন্ধ রয়েছে ক্লাস। সব মিলিয়ে নষ্ট হয়েছে পাঁচ লাখ ৬৭ হাজার শিক্ষাঘণ্টা। অন্তত ছয়টি বিভাগের চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিত থাকায় শিক্ষার্থীদের সেশনজটের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
এত কিছুর পরও দীর্ঘ সময় সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কার্যকর আলোচনা শুরু হয়নি, অচলাবস্থা কাটানোর কোনো কর্মকৌশলও ঠিক করা হয়নি। আন্দোলন শুরুর ২৭ দিন পর ১৮ অক্টোবর মন্ত্রণালয় ইউজিসিকে কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে দুর্গাপূজার ছুটি শুরু হওয়ায় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। আন্দোলনকারীদের মূল দাবিও প্রত্যাহার হয়নি, ক্লাস-পরীক্ষাও চালু হয়নি। তার ওপর যে সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেই সভা নিয়েই রয়েছে বিতর্ক।
চুয়েটের প্রথম উপাচার্য প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠে এক মাস ধরে অচলাবস্থা চললেও মন্ত্রণালয়ের নীরবতা খুবই দুঃখজনক। তাঁর ভাষ্য, যে উপাচার্যকে নিয়ে এত আপত্তি ও ঘটনা, তাঁকে মন্ত্রণালয়ের সুপারিশেই আচার্য বা রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের নির্লিপ্ততায় এই এক মাসে চুয়েটের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেছে বলে মনে করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. মো. মঈনুল ইসলাম বলেন, সিন্ডিকেট সভায় চুয়েটের কোনো শিক্ষক অংশ নেননি এবং শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গেও কারও আলোচনা হয়নি। শিক্ষক সমিতিও অসহযোগ আন্দোলনে আছে। এ অবস্থায় ক্লাস ও পরীক্ষা শুরুর যে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে, তা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা তাঁর কাছে বোধগম্য নয়।
চুয়েটের সংকট এখন আর শুধু উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আস্থা এবং শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালুর প্রশ্ন। কমিটি গঠনের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কার্যকর সংলাপ ছাড়া সমাধান কতটা সহজ হবে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে ছুটির কারণে ক্যাম্পাস ফাঁকা থাকায় কমিটির কাজ শুরু করতেও কিছুটা সময় লাগতে পারে। ফলে সেশনজট এড়িয়ে দ্রুত শিক্ষা কার্যক্রমে ফেরা নির্ভর করবে কমিটির নিরপেক্ষতা এবং সব পক্ষের আস্থা অর্জনের ওপর।

