শিক্ষক একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষকতা পেশা বর্তমানে একাধিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে রয়েছে বেতন-ভাতা, সামাজিক মর্যাদা ও পদোন্নতির সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে রয়েছে পেশাগত দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি। বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের শিক্ষকরা শুধু সুযোগ-সুবিধার দিক থেকেই পিছিয়ে নেই, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক।
এই সংকট শুধু শিক্ষকদের ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর।
বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়গুলোর একটি হলো মেধাবী শিক্ষকদের ধরে রাখতে না পারা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অন্য ক্যাডারে চলে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ৪৪তম বিসিএসের পরও শিক্ষা ক্যাডারের কয়েকজন কর্মকর্তা প্রশাসন, পররাষ্ট্র, করসহ অন্যান্য ক্যাডারে যোগ দিয়েছেন। শুধু একটি বিসিএস নয়, প্রায় প্রতিটি বিসিএসেই শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা অন্য সুযোগ পেলে শিক্ষকতা ছেড়ে দিচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তুলনামূলক কম সুযোগ-সুবিধা, ধীর পদোন্নতি এবং সামাজিক মর্যাদা কমে যাওয়ার কারণে অনেকেই বিকল্প পেশাকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করছেন।
প্রাথমিক শিক্ষা স্তরেও একই ধরনের সংকট রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভিত্তি তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই স্তরের শিক্ষকদের ক্যারিয়ার কাঠামো এখনো সীমিত। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকের ন্যূনতম যোগ্যতা স্নাতক ডিগ্রি হলেও তাদের চাকরির গ্রেড ১৩তম, যা একই শিক্ষাগত যোগ্যতার অন্যান্য সরকারি চাকরির তুলনায় কম। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পদোন্নতির সুযোগ। সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক হওয়াই মূল পদোন্নতির ধাপ, কিন্তু এই পদোন্নতি দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে।
এর ফলে অনেক শিক্ষক দীর্ঘদিন একই পদে থেকে যাচ্ছেন এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধেকেই প্রধান শিক্ষকের পদ বর্তমানে খালি রয়েছে। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রম ও পাঠদান উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
শিক্ষকদের দক্ষতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান উদ্বেগজনক। ইউনেস্কোর বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫ অনুযায়ী, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ১২টি দেশের মধ্যে ন্যূনতম যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর একটি। প্রাথমিক স্তরে বাংলাদেশে ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষক ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের আওতায় রয়েছেন। যেখানে ভুটান ও কাজাখস্তানে এই হার শতভাগ, ভারতে ৯১ দশমিক ৭ শতাংশ, নেপালে ৯৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং শ্রীলংকায় ৮৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরেও পরিস্থিতি খুব বেশি ভিন্ন নয়। নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হার বাংলাদেশে মাত্র ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশ। মাধ্যমিক স্তরে এই হার ৫৫ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে।
শিক্ষকদের আর্থিক অবস্থাও একটি বড় সমস্যা। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বড় অংশ সরকারি অর্থ সহায়তার আওতায় থাকলেও তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা এখনো সীমিত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি কোষাগার থেকে বেতন পাওয়া শিক্ষকদের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশই এমপিওভুক্ত। এসব শিক্ষক ১১তম গ্রেডে যোগদান করেন এবং প্রবেশন পর্যায়ে তাদের মোট বেতন ১৫ হাজার ৮৭৫ টাকা, যা দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্নগুলোর একটি। অবসর-পরবর্তী অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক শিক্ষক দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষক সংকট রয়েছে। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের সহকারী শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল নাহিয়ানের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ১৬ হাজার সহকারী শিক্ষক পদের মধ্যে প্রায় ৭ হাজার পদ খালি রয়েছে। এর ফলে কর্মরত শিক্ষকদের অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হচ্ছে এবং কাজের চাপ বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পদোন্নতির সুযোগ না থাকাও শিক্ষকদের অন্যতম বড় সমস্যা। অনেক শিক্ষক সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে একই পদে অবসর গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিন ধরে এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারেও পদোন্নতির জটিলতা রয়েছে। অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিয়মিত পদোন্নতি পেলেও শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি তুলনামূলক ধীর। গত পাঁচ বছরে শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষকদের পদোন্নতি হয়েছে মাত্র একবার। ফলে অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, সমমানের অন্যান্য সরকারি ক্যাডারের তুলনায় তারা পিছিয়ে পড়ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও সমস্যা রয়েছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলক ভালো, তবে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার কাঠামো এখনো শক্তিশালী নয়। পাশাপাশি গবেষণায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল। কিউএস ও টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের সেরা ৫০০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় নেই।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই সংকটের মূল কারণ হলো শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের অবহেলা, দুর্বল বেতন কাঠামো, সীমিত পদোন্নতির সুযোগ এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, পদোন্নতির বৈষম্য, অপর্যাপ্ত বেতন-ভাতা এবং অনিয়মপূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও নজরদারির অভাব শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির পথেও বাধা তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, সম্মানজনক বেতন কাঠামো, স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং কার্যকর পদোন্নতি কাঠামো নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে হলে শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান, বৈষম্যহীন পদোন্নতি এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি এবং বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হলে প্রথমে শিক্ষকদের অবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শ্রেণিকক্ষে থাকা শিক্ষকের ওপর। শিক্ষক যদি আর্থিক নিরাপত্তা, পেশাগত উন্নয়ন এবং সামাজিক মর্যাদা না পান, তাহলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। তাই শিক্ষকতা পেশাকে আবারও মেধাবীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনাই হওয়া উচিত দেশের শিক্ষা সংস্কারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

