চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সেপ্টেম্বরের বেতন ও উৎসব ভাতা আটকে থাকার দায় অস্বীকার করেছেন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। তাঁর কারণে বেতন-ভাতা আটকে আছে, এমন অভিযোগকে তিনি পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও সত্যের অপলাপ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে কর্মকর্তাদের সংগঠনের দাবি, বেতন ছাড়ে উপাচার্যের স্বাক্ষরই লাগে না। ফলে বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান পরস্পরবিরোধী।
আজ বুধবার উপাচার্য বলেন, উত্থাপিত বক্তব্যের সঙ্গে তিনি একেবারেই একমত নন। তাঁর ভাষ্য, বিধি অনুযায়ী বেতন-ভাতা ছাড়ের লক্ষ্যে গত ২৮ সেপ্টেম্বর কম্পট্রোলার দপ্তরের ১১ কর্মকর্তাকে ই-মেইলে জরুরি সভায় ডাকা হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের কেউই ওই সভায় উপস্থিত হননি।
উপাচার্য আরও জানান, পরে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিধিমালা মেনে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৩ অনুসরণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সামগ্রিক বিষয় পর্যালোচনা করছে এবং বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে।
বকেয়া বেতন ও উৎসব ভাতা দ্রুত ছাড়ের বিষয়ে নীতিগতভাবে তিনি সম্পূর্ণ একমত বলে জানান উপাচার্য। তাঁর দাবি, এ সংকট নিরসনে তিনি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছেন। কম্পট্রোলার দপ্তরকে বেতন-ভাতার পে-রোল প্রস্তুত রাখতে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পাসে ফিরে বিধি মেনে বেতন-ভাতার বিলে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া এবং তা ছাড় করাই হবে তাঁর প্রধান দাপ্তরিক কাজ।
এর আগে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, চুয়েটের এক হাজার ৮৭ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সেপ্টেম্বরের বেতন ও উৎসব ভাতা আটকে আছে। সোনালী ব্যাংকের চুয়েট শাখার ব্যবস্থাপক তখন জানিয়েছিলেন, হিসাব নিয়ন্ত্রক ও উপহিসাব নিয়ন্ত্রকের স্বাক্ষরিত বেতন-ভাতার শিট তাঁরা গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু উপাচার্যের চিঠির পর তা স্থগিত রাখা হয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে আইনি মতামত চাওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
চুয়েট অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রকৌশলী সৈয়দ মোহাম্মদ ইকরামের দাবি ভিন্ন। তাঁর বক্তব্য, প্রচলিত নিয়মে বেতন-বোনাস পরিশোধে উপাচার্যের স্বাক্ষর লাগে না। হিসাব নিয়ন্ত্রক ও উপহিসাব নিয়ন্ত্রকের স্বাক্ষরেই ব্যাংক থেকে বেতন-বোনাস ছাড় হয়।
এই বিতর্কের পেছনে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় প্রশাসনিক সংকট। নতুন উপাচার্যের নিয়োগ বাতিল এবং সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছে। এর সঙ্গে সংহতি জানিয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশ কর্মবিরতিতে আছেন। এতে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
দুই পক্ষের বক্তব্য মিলিয়ে দেখলে মূল প্রশ্ন দাঁড়ায়, বেতন ছাড়ে উপাচার্যের ভূমিকা বিধিতে ঠিক কী। উপাচার্যের ভাষ্য অনুযায়ী বিলে তাঁর চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন। অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন বলছে, এর দরকারই নেই। আবার ব্যাংকের বক্তব্য অনুযায়ী, উপাচার্যের চিঠির পরই বেতন স্থগিত হয়েছে। তবে চিঠিতে কী লেখা ছিল, তা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। কম্পট্রোলার দপ্তরের কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যাও জানা যায়নি। তাঁরা কেন সভায় যাননি, সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী এক হাজার ৮৭ জনের জন্য এই বিতর্ক সরাসরি পারিবারিক ব্যয়ের চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে উৎসব ভাতা আটকে থাকায়। আন্দোলন ও কর্মবিরতি চলতে থাকলে সংকট আরও দীর্ঘ হতে পারে।
এখন নজর থাকবে ইউজিসি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ব্যাংকের আইনি মতামতের দিকে। এসব সিদ্ধান্ত দ্রুত এলে বেতন-ভাতা ছাড়ের পথ খুলতে পারে। তা না এলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

