চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) শিক্ষার্থীদের চলমান ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির মধ্যেই নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম আজ সোমবার নিজের দপ্তরে প্রবেশ করেছেন। আন্দোলনকারীদের দেওয়া তালা ভেঙে তিনি ভেতরে ঢুকেছেন বলে শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের বক্তব্যে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, তাঁরা উপাচার্যকে সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগের অনুরোধ জানাবেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপাচার্য আজ সকাল ৯টার দিকে একটি মাইক্রোবাসে করে ক্যাম্পাসে পৌঁছান। প্রধান ফটকে তিনি নিজেকে শুধু একজন শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভেতরে ঢোকেন। এরপর নিজের কার্যালয়ে গিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের লাগানো তালা ভেঙে তিনি দপ্তরে প্রবেশ করেন। সূত্রের বরাতে আরও জানা যায়, সে সময় তাঁকে ক্যাম্পাস শাখা ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে দেখা গেছে।
ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অবশ্য এ তথ্যের ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। চুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ বলেন, উপাচার্য যখন দপ্তরে ঢোকেন, তখন তাঁরা সঙ্গে ছিলেন না। তাঁর ভাষ্য, উপাচার্য শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে দপ্তরে গিয়েছেন। উপাচার্য এসেছেন শুনে তাঁরা শুভেচ্ছা জানাতে পরে সেখানে যান বলেও জানান তিনি। অর্থাৎ উপাচার্যের সঙ্গে কারা ছিলেন, সে বিষয়ে দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে।
আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব জানান, নবনিযুক্ত উপাচার্য সকালে শিক্ষক পরিচয়ে প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকেছেন। এরপর তালা ভেঙে কার্যালয়ে প্রবেশ করেছেন। পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা এখন উপাচার্যের কার্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেখানে গিয়ে তাঁরা উপাচার্যকে সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করতে অনুরোধ করবেন। তাঁর দাবি, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ শান্তিপূর্ণভাবেই চলবে।
পুরো ঘটনার পটভূমি বুঝতে একটু পেছনে তাকাতে হয়। গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে তিনি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। অধ্যাপক সায়েমকে সরানোর প্রতিবাদে এবং তাঁকে পুনর্বহালের দাবিতে পরদিন থেকেই শিক্ষার্থীরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন। নতুন উপাচার্যের নিয়োগকে কেন্দ্র করেই আন্দোলনের সূত্রপাত।
আন্দোলন এখন শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও একই দাবিতে নিয়োগের পরদিন থেকে কর্মবিরতি পালন করছেন। এর ফলে প্রায় ২০ দিন ধরে চুয়েটে কোনো ক্লাস বা পরীক্ষা হয়নি। এতে হাজারো শিক্ষার্থীর একাডেমিক কার্যক্রম থমকে আছে। সেশনজটের আশঙ্কাও ক্রমে বাড়ছে।
উপাচার্য তালা ভেঙে প্রবেশ করায় পরিস্থিতি জটিল হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। একদিকে সরকারি নিয়োগে দায়িত্ব পাওয়া উপাচার্য নিজের কার্যালয়ে বসে দায়িত্ব পালন শুরু করতে চাইছেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের বড় অংশ এই নিয়োগ মানতে নারাজ। ফলে উপাচার্য কার্যালয়কে ঘিরে দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির কথা বলায় আলোচনার পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।
তালা ভাঙার ঘটনাটিও আলাদা তাৎপর্য বহন করে। আন্দোলনকারীদের কাছে দপ্তরের তালা ছিল তাঁদের অবস্থানের প্রতীক। সেই তালা ভেঙে প্রবেশ করা তাঁরা কীভাবে দেখেন, তার ওপর পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে। এ নিয়ে চুয়েট শিক্ষক সমিতির সহ-সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক সামিউন বশীরের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হয়েছিল। একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা ধরেননি। ফলে শিক্ষকদের সংগঠনের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে চুয়েটের সংকট এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে দ্রুত সমঝোতা না হলে ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়তে পারে। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে। আন্দোলনকারীদের দাবি, উপাচার্যের পদত্যাগ। অন্যদিকে নিয়োগ প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ ও নতুন উপাচার্যের অবস্থান কী হবে, তা এখনো জানা যায়নি। এখন দেখার বিষয়, আজ উপাচার্য ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরাসরি কথা হয় কি না এবং তা সংকট সমাধানের দিকে কতটা এগোয়।

