আগামী শিক্ষাবর্ষ ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে পরিবর্তন আনছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা-সংক্রান্ত বর্ণনাও। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এ বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনা দাঁড়াচ্ছে তিন রকম।
আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীর পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপা হচ্ছে। পরিমার্জনের কাজ শেষ হয়েছে, এখন ছাপার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু বই ছাপাও হয়ে গেছে।
২০২৭ সালের সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের প্রথম অধ্যায়ের নাম ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও গণ-আন্দোলন’। এই অধ্যায়ে মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। নতুন বর্ণনায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। রাজারবাগ পুলিশ লাইনস আক্রান্ত হলে সেখান থেকে তারবার্তার মাধ্যমে আক্রমণের খবর সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই রাতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। দেশের মানুষ নেতৃত্বশূন্যতায় দিশেহারা হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে গণহত্যার খবর জেনে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে বিদ্রোহ করেন। ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটে তিনি ব্যাটালিয়নের সব বাঙালি অফিসার ও সৈনিককে একত্র করে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দেন। বইয়ে বলা হয়েছে, এর পরই আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। পরে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপিত হলে ২৭ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় জিয়াউর রহমান অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও লিবারেশন আর্মির সর্বাধিনায়ক হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
এরপর বেতারে আরেকটি ঘোষণায় তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মির অস্থায়ী সর্বাধিনায়ক হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বইয়ে লেখা হয়েছে, এই ঘোষণা মুক্তিকামী বাঙালিকে উজ্জীবিত করেছে। শেষ পর্যন্ত ১৬ ডিসেম্বর জনযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে পাকিস্তানিদের ২৪ বছরের শোষণ ও বৈষম্যের অবসান ঘটে এবং ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত সপ্তম শ্রেণির একই বইয়ে ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের পতনের পর দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার পাঠ্যবই ও শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করে। সেই বইয়ে বলা হয়েছে, ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হামলা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনস আক্রান্ত হওয়ার পর তারবার্তায় খবর ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং বঙ্গবন্ধুকে সেই রাতেই বন্দি করা হয়। ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, আর ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আবারও ঘোষণা দেন। বইটি চলতি শিক্ষাবর্ষে পড়ানো হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছিল আরেক রকম বর্ণনা। এনসিটিবির ওয়েবসাইটে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের সপ্তম শ্রেণির ওই বই পাওয়া যায় না। তবে ২০২২ সালের পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে, অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মাধ্যমে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
স্বাধীনতার ঘোষণা ছাড়াও আগামী শিক্ষাবর্ষের ইতিহাস অংশে আরও কিছু বিষয় যুক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা। এ ছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা একটি নিবন্ধও পাঠ্যবইয়ে থাকছে।
ইতিহাসের পাশাপাশি বাংলা এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়েও নতুন বিষয়বস্তু যুক্ত হচ্ছে। চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই আসছে। চতুর্থ শ্রেণির বই দুটি ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’, আর ষষ্ঠ শ্রেণির বই দুটি ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গবেষক আফসান চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্রের ইতিহাসের পরিবর্তন প্রত্যেক সরকারই করে এবং ভবিষ্যতেও হয়তো করবে। তাঁর মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চার নামে এখানে ইতিহাসের চেয়ে রাজনীতির চর্চাই বেশি হয়।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট দিক হলো, সরকার বদলালে পাঠ্যবইয়ের বর্ণনাও বদলে যাচ্ছে। ফলে একেক সময়ে শিক্ষার্থীরা একেক রকম বিবরণ পড়ছে, যা শিশুদের কাছে ইতিহাসের একটি অভিন্ন ও স্থায়ী রূপ পৌঁছে দেওয়ার প্রশ্নটিকে সামনে এনেছে। তবে অনেকের মতে, ইন্টারনেটের যুগে শিক্ষার্থীদের হাতে এখন বিপুল তথ্য আছে এবং তারা নানা সূত্র থেকে যাচাই করার সুযোগ পায়।
স্বাধীনতার ঘোষণার ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়। তাই পাঠ্যবইয়ের বর্ণনা কীভাবে লেখা হবে, তা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। এখন নজর থাকবে নতুন বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানোর পর বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়ার দিকে। একই সঙ্গে ইতিহাসবিদ ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে এ নিয়ে কোনো সর্বসম্মত অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

