এনসিটিবির ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত উৎপাদন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রাক্-প্রাথমিক স্তরের ৯৮ দশমিক ২১ শতাংশ বই ছাপা শেষ হয়েছে। অন্যদিকে, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার অগ্রগতি ৮৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। ইবতেদায়ি স্তরে ৬৪ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির মাধ্যমিক স্তরে ৫১ দশমিক ১৮ শতাংশ বই মুদ্রিত হয়েছে।
বিশেষ করে অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপায় ধীরগতির কারণে নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করতে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে এনসিটিবি।
৩০ কোটি ৭১ লাখের বেশি বই ছাপার উদ্যোগ
এ বছর মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১টি পাঠ্যবই ছাপার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রাক্-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাশাপাশি ইবতেদায়ি, দাখিল, বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার বইও এর আওতায় রয়েছে।
এ ছাড়া ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় পাঠ্যসামগ্রীও ছাপানো হচ্ছে।
পাঠ্যবই মুদ্রণের জন্য ৬২৩টি ভাগে মোট ১১৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে। সময়মতো বই সরবরাহ নিশ্চিত করতে গত বছরের তুলনায় এবার এক মাস আগে ছাপার কার্যক্রম শুরু করা হয়।
এনসিটিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাক্-প্রাথমিক স্তরের মোট ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি বইয়ের মধ্যে ৫৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩টি ছাপা হয়েছে। এই স্তরে বই সরবরাহের আগের মান যাচাই কার্যক্রম শেষ হয়েছে ৮৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য নির্ধারিত ৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬টি বইয়ের মধ্যে ৬ কোটি ৬৬ লাখ ২৯ হাজার ১৭৩টি ছাপা হয়েছে। এ স্তরে সরবরাহের আগের মান যাচাই সম্পন্ন হয়েছে ৭৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ বইয়ের।
অন্যদিকে, ইবতেদায়ি প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য নির্ধারিত ৪ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭৪টি বইয়ের মধ্যে ২ কোটি ৬৭ লাখ ১০ হাজার ৭৮৪টি ছাপা হয়েছে। এসব বইয়ের ৫১ দশমিক ১১ শতাংশের মান যাচাই শেষ হয়েছে।
মাধ্যমিকের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির জন্য মোট ১৭ কোটি ৯৫ লাখ ৪৩ হাজার ১৮টি বই ছাপার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৯ কোটি ১৮ লাখ ১৭ হাজার ৫৬টি বই ছাপা হয়েছে। তবে এই স্তরে সরবরাহের আগের মান যাচাই সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৩৭ দশমিক ০৫ শতাংশ বইয়ের।
ধীরগতির কারণে ৩২ প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে জানিয়েছেন, প্রাক্-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে বই ছাপার কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। ইবতেদায়ি এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বই মুদ্রণও অর্ধেকের বেশি সম্পন্ন হয়েছে।
তবে অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। কয়েকটি ভাগের কাজের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করতে হওয়ায় এই বিলম্ব তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
চেয়ারম্যানের তথ্য অনুযায়ী, মুদ্রণের কাজে ধীরগতির জন্য ইতিমধ্যে ৩২টি ছাপাখানাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে যেসব প্রতিষ্ঠান সময়মতো কাজ শেষ করতে পারছে না, তাদের চুক্তি বাতিল করে অন্য প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হবে।
এনসিটিবির পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বইয়ের কয়েকটি ভাগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, এসব শ্রেণির অর্ধেক বই আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ের বিতরণকেন্দ্রে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এই সময়সীমা সামনে রেখে ছাপাখানাগুলোতে তদারকি বাড়ানো হয়েছে।
নিম্নমানের প্রায় সাড়ে ৯ লাখ ছাপা ফর্মা বাতিল
শুধু নির্ধারিত সময়ে বই সরবরাহ নয়, ছাপার মান নিশ্চিত করতেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে এনসিটিবি। এ জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির সমন্বয়ে গঠিত ৫৩টি তদারকি দল দেশের বিভিন্ন মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, এসব দল সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করার পাশাপাশি সন্ধ্যা থেকে গভীর রাতেও ছাপাখানায় তদারকি করছে।
মান যাচাইয়ে ত্রুটি পাওয়ায় ৩৬টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের ছাপানো ফর্মা ও বই বাতিল করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার নিম্নমানের ছাপা ফর্মা এবং প্রায় ১২ হাজার বই গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে জানিয়েছে এনসিটিবি।
কর্তৃপক্ষের মতে, নির্ধারিত সময়ে বই সরবরাহের তাগিদ থাকলেও মানের সঙ্গে আপস করার সুযোগ নেই। ছাপার কাগজ, মুদ্রণের মান এবং বইয়ের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত যাচাই করা হচ্ছে।
নভেম্বরের মধ্যে মাধ্যমিকের ৯৫ শতাংশের বেশি বই সরবরাহের আশা
এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তকবিষয়ক সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু জানিয়েছেন, নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী পাঠ্যবই বিতরণের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।
তাঁর আশা, অক্টোবরের শেষ নাগাদ প্রাথমিক স্তরের ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশ বই ছাপা সম্পন্ন হবে। একই সঙ্গে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের ৯৫ শতাংশের বেশি বই বিতরণকেন্দ্রে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
বই গ্রহণের সময় মান যাচাইয়ের জন্য জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সরাসরি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পাঠ্যবই গ্রহণের পর মানসংক্রান্ত ত্রুটি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
নিম্নমানের বই সরবরাহ করলে ছাড় নয়
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. এ এন এম এহসানুল হক মিলন জানিয়েছেন, নিম্নমানের কাগজে ছাপানো পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, বাজারদর পর্যালোচনা করেই পাঠ্যবই মুদ্রণের যুক্তিসংগত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে কম দামে কাজ পাওয়ার অজুহাতে কোনো মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের বই তৈরি করতে পারবে না।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানসম্মত বই সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছেন মন্ত্রী।
সময়মতো বই পৌঁছানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া শিক্ষাকার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মাধ্যমিকের কয়েকটি শ্রেণির বই ছাপার অগ্রগতি এখনো তুলনামূলক কম থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
এনসিটিবি জানিয়েছে, ৩০ নভেম্বরের লক্ষ্য পূরণে মুদ্রণ, মান যাচাই ও বিতরণ কার্যক্রমে তদারকি অব্যাহত রয়েছে।
তবে শুধু বই ছাপা শেষ করলেই হবে না; মান যাচাইয়ের পর সেগুলো উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছানো এবং সেখান থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথাসময়ে বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। এসব ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করা গেলেই ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের শুরুতে প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

