রাজধানীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগেই খেলার মাঠ নেই। কোথাও শিক্ষক সংকট, কোথাও শ্রেণীকক্ষের স্বল্পতা, আবার কোথাও স্যাঁতসেঁতে ভবনে চলছে পাঠদান। কিছু স্কুলে পর্যাপ্ত টয়লেট, নিরাপদ পানি ও সূর্যের আলো ঢোকার সুযোগও সীমিত।
ফলে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত পাঠের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক বিকাশের উপযোগী পরিবেশ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। এসব কারণে সন্তানকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক অভিভাবক। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার একাধিক স্কুল ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ৩৪২টি। এর মধ্যে মাত্র ৯০টিতে খেলার মাঠ রয়েছে। অর্থাৎ ২৫২টি স্কুলে, যা মোট স্কুলের প্রায় ৭৩ দশমিক ৭ শতাংশ, কোনো মাঠ নেই। জায়গার অভাব এবং স্কুল প্রাঙ্গণে ভবনসহ নানা স্থাপনা নির্মাণের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করা যায়নি।
অবকাঠামোর সংকটের পাশাপাশি শিক্ষকস্বল্পতাও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সূত্রাপুরের ৩৯টি, মিরপুরের ২১টি ও গুলশানের ১৮টি বিদ্যালয়ে শিক্ষক আছেন ১০ জনেরও কম। কিছু স্কুলে শিক্ষক এতই কম যে হাতে গোনা কয়েকজনকে একাধিক শ্রেণীর পাঠদান সামলাতে হচ্ছে। অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, বাংলাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক মাত্র একজন। আ. মান্নান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আছেন পাঁচজন।
মিরপুরের নয়ানগর রফিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩০৬ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক ছয়জন। সেই হিসাবে প্রতি শিক্ষকের ভাগে গড়ে ৫১ জন শিক্ষার্থী পড়ে। অথচ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক স্তরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:৩০-এ নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। শিক্ষক কম থাকায় পাঠদানের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও পরীক্ষাসংক্রান্ত কাজও অল্প কয়েকজনকে করতে হচ্ছে। ফলে প্রতিটি শ্রেণীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
রাজধানীর পলাশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে খেলার মাঠ নেই। আশপাশে উঁচু ভবন থাকায় স্কুলটিতে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো ঢোকে না। এতে ভবনের ভেতরে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারি স্কুলে সন্তানকে ভর্তির পরিকল্পনা বদলেছেন অনেক অভিভাবক। বেসরকারি চাকরিজীবী আতিয়া সুলতানা বণিক বার্তাকে বলেন, বাসার কাছে সরকারি স্কুল থাকলেও পরিবেশ তাঁর উপযুক্ত মনে হয়নি। সেখানে মাঠ ছিল না। তাঁর মতে, সন্তানের পূর্ণ বিকাশের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার সুযোগও জরুরি। অভিভাবক অর্ণব মাহমুদও সন্তানকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দিতে আগ্রহী নন। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও পরিবেশগত সুযোগ বিবেচনায় নিয়ে সন্তানের স্কুল বেছে নিতে চান বলে জানান তিনি।
তবে অভিভাবকদের এই নেতিবাচক ধারণার সঙ্গে একমত নন বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি। তাঁর দাবি, অনেক সচ্ছল অভিভাবক সরকারি প্রাথমিক স্কুলকে নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানদের প্রতিষ্ঠান মনে করেন। সে কারণে তাঁরা কিন্ডারগার্টেন বা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে সন্তানদের পাঠাতে আগ্রহী। অথচ সরকারি প্রাথমিক স্কুলের পড়াশোনা ও ফলাফলও ভালো বলে তিনি মনে করেন।
শিক্ষক সংকটের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, কিছু স্কুলে সংকট আছে। কোনো কোনো শিক্ষক দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকেন, কেউ আবার চাকরিতে থেকেই অন্য শহরে বা বিদেশে চলে যান। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত কার্যকর প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ দরকার বলে মত দেন তিনি।
আজিমপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. তুহিনের বাবা মো. রিপন বলেন, সামর্থ্য নেই বলে ছেলেকে ভালো কোনো বেসরকারি স্কুলে পড়াতে পারেন না। সবাই বলে সরকারি প্রাথমিক স্কুলের মান খারাপ হচ্ছে। তবে তাঁর বিশ্বাস, কেউ ভালো করতে চাইলে যেকোনো স্কুল থেকেই ভালো করতে পারে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ঢাকা মহানগরীর সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলোর সংকট দীর্ঘদিনের। মাঠ না থাকায় শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাঁর মতে, শুধু শ্রেণীকক্ষের পাঠে শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশ হয় না। শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চাও দরকার। তিনি আরও বলেন, এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন আয়ের ও শ্রমজীবী পরিবারের শিশুরা। স্কুলের বাইরে নিরাপদ খেলার জায়গা না থাকলে তাদের সুস্থ বিনোদন ও বিকাশের সুযোগ আরও কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঠ্যক্রমে খেলাধুলা রাখাই যথেষ্ট নয়, বাস্তবে তা চর্চার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। যেসব স্কুলের নিজস্ব মাঠ নেই, সেখানকার শিক্ষার্থীদের জন্য কাছাকাছি সরকারি মাঠ বা খোলা জায়গা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এজন্য স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় দরকার। ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীতে নতুন স্কুলের জন্য জমি পাওয়া কঠিন। তাই বিদ্যমান স্কুলের জায়গা রক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার, শিক্ষক সংকট কমানো এবং মাঠহীন স্কুলের জন্য বিকল্প খেলাধুলার ব্যবস্থা করা জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তাফিজুর রহমান শাহিন অভিযোগ করেন, শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগও অবহেলার শিকার হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, সচেতন অভিভাবকেরা সন্তানের পড়াশোনার পাশাপাশি সার্বিক বিকাশের জন্য খেলার মাঠ, সুন্দর পরিবেশ, মানসম্মত ভবন ও আধুনিক শিক্ষাপ্রযুক্তির সুবিধা চান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ঢাকার অনেক স্কুলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এসব সুবিধা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ধারণা ও বাস্তবতার একটি ব্যবধান স্পষ্ট। শিক্ষক সমিতির নেতাদের একাংশ বলছেন, সরকারি স্কুলের পড়াশোনা ও ফল ভালো। অন্যদিকে মাঠ, শিক্ষক ও ভবনের বাস্তব ঘাটতি অভিভাবকদের আস্থায় চিড় ধরাচ্ছে। এই অবকাঠামোগত ও জনবল-সংকটের সমাধান না হলে অভিভাবকদের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে। এখন দেখার বিষয়, কর্তৃপক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও মাঠবিহীন স্কুলের বিকল্প ব্যবস্থায় কী উদ্যোগ নেয়।

