চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার কমে যাওয়ায় দেশের উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় ধরনের শিক্ষার্থী সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, সব উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হলেও প্রায় ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৬০৩টি আসন ফাঁকা থেকে যেতে পারে। এতে বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ এবং অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংকটে পড়তে পারে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, এবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ভর্তি প্রতিযোগিতা আগের তুলনায় কিছুটা কম হতে পারে। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানের মোট আসনের তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। তবে দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিযোগিতা আগের মতোই থাকতে পারে।
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। সব শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত শনিবার প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্নাতক ও সমমান পর্যায়ে মোট আসন রয়েছে প্রায় ১৪ লাখ ৯২ হাজার ২৮৮টি। সেই হিসাবে উত্তীর্ণ সব শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকবে।
কমেছে পাসের হার ও জিপিএ-৫
এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছর এই হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ।
শুধু পাসের হার নয়, সর্বোচ্চ ফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৯৭। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩।
ফলাফলের এই অবনতি উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সামগ্রিক চিত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষ করে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগ্রহ বেশি থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিতার ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে।
২০০৪ সালের পর এবারই এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার এত কম হয়েছে। ওই বছর পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। পরের বছর ২০০৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯ দশমিক ০৭ শতাংশে। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে পাসের হার বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেলেও এবার সেই ধারায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
উচ্চশিক্ষায় আসন কত, ফাঁকা থাকবে কত
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে আসন রয়েছে ৬৩ হাজার ৬৫৬টি। সরকারি মেডিকেল কলেজে ৫ হাজার ১০০টি এবং বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ৬ হাজার ২৭৮টি আসন রয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি ডেন্টাল কলেজে ৫৪৫টি, বেসরকারি ডেন্টাল কলেজে ১ হাজার ৩৫০টি এবং আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজে ৩৫০টি আসন রয়েছে। দেশের ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে আসনসংখ্যা ৪ লাখ ১০ হাজার।
সবচেয়ে বেশি আসন রয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি ও বেসরকারি কলেজগুলোতে। এসব প্রতিষ্ঠানে স্নাতক পাস, স্নাতক সম্মান এবং কারিগরি বা সমমানের বিভিন্ন কোর্স মিলিয়ে আসন রয়েছে ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৯৫টি।
এ ছাড়া ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বিভিন্ন মাদ্রাসায় ১১ হাজার ৫৫টি এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪২ হাজার ৪৩৪টি আসন রয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ৭২০টি, টেক্সটাইল কলেজে ৭২০টি এবং মেরিন কলেজে ৬৬০টি আসন রয়েছে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে আসন রয়েছে ৩ হাজার ৭৯০টি। আন্তর্জাতিক বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮০০টি এবং নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষায় ৫ হাজার ৬০০টি আসন রয়েছে।
সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষার এই বিশাল আসনসংখ্যার বিপরীতে এবার উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী মাত্র ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। ফলে শিক্ষার্থী ও আসনের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
প্রতিযোগিতা কমতে পারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের প্রধান লক্ষ্য থাকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। এসব প্রতিষ্ঠানে এবার মোট আসন রয়েছে প্রায় ৬০ হাজার। অথচ জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪০ হাজার ৮৪।
এ পরিস্থিতিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির প্রতিযোগিতা তুলনামূলক কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শুধু জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে ভর্তি প্রতিযোগিতার পুরো চিত্র নির্ধারণ করা যায় না। কারণ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় আবেদনের যোগ্যতা, বিষয়ভিত্তিক শর্ত এবং শিক্ষার্থীদের পছন্দও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে নামকরা কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষায়িত বিষয়ে পড়তে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ থাকতে পারে। তবে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত এবং আর্থিকভাবে দুর্বল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান সীমিত অবকাঠামো, শিক্ষকসংকট ও আর্থিক সমস্যার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, তাদের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে বেশি চাপে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ
উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থী সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে। কারণ, দেশের উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের মোট আসনের বড় অংশই এসব প্রতিষ্ঠানে রয়েছে। অথচ এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা তাদের মোট আসনের তুলনায় অনেক কম।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আমানুল্লাহ ফেরদৌস জানিয়েছেন, এবার এইচএসসিতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর তুলনায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনসংখ্যা বেশি। ফলে কয়েক লাখ আসন খালি থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
তিনি জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কারিগরি বিষয়ে নতুন কোর্স চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদেরও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সাধারণ শিক্ষার বাইরে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ বাড়তে পারে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণের নতুন পথও তৈরি হতে পারে।
ফল বিপর্যয়ের পেছনে যেসব কারণ
এবারের ফলাফল বিশ্লেষণে কয়েকটি কারণ সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন, ইংরেজি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং হিসাববিজ্ঞানের মতো বিষয়ে শিক্ষার্থীদের তুলনামূলক খারাপ ফল এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কয়েক বছর ধরে শিক্ষাব্যবস্থায় নানা পরিবর্তন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়া এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে করোনাকালীন শিক্ষাব্যবস্থার বিঘ্নের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
তবে ফলাফলের এই অবনতি শুধু পরীক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষার মান, পাঠদানের পদ্ধতি, মূল্যায়নব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির পরিবেশও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিয়ে উদ্বেগ নেই সরকারের
উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসনসংকটের কোনো আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। গত শনিবার সচিবালয়ে এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, উত্তীর্ণ সব শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার পরও উচ্চশিক্ষার অনেক আসন খালি থাকবে।
তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগের চেয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাওয়া নিয়েই বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে এবারের এইচএসসি ফলাফল দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য শিক্ষার্থী ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে শুধু আসন পূরণের চিন্তা না করে শিক্ষার মান উন্নয়ন, কর্মমুখী কোর্স চালু এবং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

