নব্বইয়ের দশকের ঢালিউডে অল্প সময়ের উপস্থিতিতেই দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন চাঁদনী। চলচ্চিত্রে তাঁর পথচলা শুরু হয়েছিল ফটোসুন্দরী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। পরে একটি সিনেমা তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। অভিনয়জীবনের পাশাপাশি জনপ্রিয় ব্যান্ড তারকা জেমসের সঙ্গে তাঁর প্রেম ও বিয়ের ঘটনাও সে সময় বিনোদন অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
তবে সেই দাম্পত্য শেষ পর্যন্ত টেকেনি। দীর্ঘ সময় ধরে চলচ্চিত্র ও বিনোদন অঙ্গন থেকে দূরে থাকা এই অভিনেত্রীর জীবনের শুরুর দিনগুলোর নানা ছবি সম্প্রতি আবার সামনে এসেছে।
কানিজ রাবেয়া রথী—বিনোদন জগতে যাঁকে দর্শক চাঁদনী নামে চিনতেন। চার ভাইবোনের পরিবারে বেড়ে ওঠা রথীর শৈশবের বেশ কিছু স্মৃতি এখনো ছবিতে সংরক্ষিত রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর প্রতি তাঁর আলাদা আগ্রহ ছিল। ছয়-সাত বছর বয়সের একটি ছবিতেও সেই স্বভাবের ছাপ দেখা যায়। পরিবারের সদস্যদের কাছেও ক্যামেরা দেখলেই পোজ দেওয়ার বিষয়টি ছিল পরিচিত দৃশ্য।
শৈশবের একটি বড় সময় কেটেছে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায়। পড়াশোনা করেছেন কিশলয় স্কুলে। কিছু সময় সলিমুল্লাহ রোডেও পরিবারের সঙ্গে ছিলেন। ১৯৮৭ সালে তাঁদের পরিবার চলে যায় উত্তরায়। পরে তিনি ভর্তি হন উত্তরা হাইস্কুলে। সেখানেই শেষ হয় তাঁর স্কুলজীবন।
রথীর বাবা চাকরি করতেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে। শৈশবের একটি ছবিতে বাবার ফ্লাইটের ক্যাপ পরে তাঁকে দেখা যায়। সেই পুরোনো ছবির সঙ্গে নিজের শৈশবের স্মৃতিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাগ করে নিয়েছেন তিনি।
মোহাম্মদপুরে থাকার সময় সংসদ ভবনও ছিল তাঁর শৈশবের স্মৃতির একটি অংশ। ভাইবোন ও বন্ধুদের সঙ্গে সেখানে হাঁটতে যাওয়ার অভ্যাস ছিল। সেই সময় সংসদ ভবন এলাকায় ঘোরাফেরার সুযোগও ছিল তুলনামূলক বেশি। পুরোনো একটি ছবিতে বান্ধবী ও ভাইবোনদের সঙ্গে তাঁকে সেখানে দেখা যায়।
তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। ‘আনন্দ বিচিত্রা ফটোসুন্দরী’ প্রতিযোগিতায় প্রথম রানারআপ হওয়ার পর বিনোদন জগতে তাঁর সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যায়। এর আগেই সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘আগমন’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রে তাঁর পরিচিতি তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
১৯৯৩ সালে মুক্তি পায় ‘অবুঝ দুটি মন’। ছবিটি রথীকে দেশের দর্শকের কাছে পরিচিত করে তোলে। চলচ্চিত্রে তিনি চাঁদনী নামেই পরিচিতি পেয়েছিলেন। ছবিটি জনপ্রিয় হলেও এরপর আর বড় পর্দায় নিয়মিত দেখা যায়নি তাঁকে। মাত্র একটি সিনেমার পরই চলচ্চিত্র থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
বড় পর্দা থেকে দূরে থাকলেও তাঁর অভিনয়জীবন সেখানেই পুরোপুরি থেমে যায়নি। পরবর্তী সময়ে নাটক, টেলিছবি ও বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করেছেন। তবে সেসব কাজ থেকেও প্রায় ১৫ বছর ধরে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন তিনি।
রথীর ব্যক্তিজীবনও সে সময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। ফটোসুন্দরী প্রতিযোগিতার পর জনপ্রিয় ব্যান্ড তারকা জেমসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়। তাঁদের প্রেমের খবর বিনোদন অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৯১ সালের ১৭ নভেম্বর তাঁদের বিয়ে হয়।
অর্থাৎ ‘অবুঝ দুটি মন’ মুক্তির প্রায় দুই বছর আগেই তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পর কিছুদিন তাঁরা ইস্কাটনে বসবাস করেন। পরে বড় ছেলে দানিশের জন্মের পর ১৯৯৫ সাল থেকে পরিবার নিয়ে উত্তরায় থাকতে শুরু করেন।
এই সংসারে তাঁদের দুই সন্তান—আবরার আলভী দানিশ ও জান্নাতুল ফেরদৌস। সময়ের সঙ্গে সন্তানরাও বড় হয়েছেন। ছেলে পড়াশোনা শেষ করে ভিডিও তৈরির কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।
একসময় যে সম্পর্ক নিয়ে বিনোদন অঙ্গনে ছিল তুমুল আলোচনা, সময়ের প্রবাহে সেই অধ্যায়ও বদলে গেছে। রথী ও জেমসের দাম্পত্য শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়নি। পরে দুজনেই নিজেদের জীবনে নতুনভাবে পথ চলেছেন।
সম্প্রতি রথীর ভাই ভিক্টরের তোলা একটি পুরোনো ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবার আলোচনায় আসে। উত্তরার বাসায় তোলা সেই ছবিতে পাশাপাশি দেখা যায় রথী ও জেমসকে। ছবিটি যেন তাঁদের জীবনের একটি পুরোনো অধ্যায়ের নীরব দলিল হয়ে আছে।
আজকের সময়ে বিনোদন জগতের আলো থেকে অনেকটাই দূরে রথী। তিন দশকের বেশি সময় আগে বড় পর্দা থেকে সরে গেলেও নব্বইয়ের দশকের দর্শকের কাছে ‘চাঁদনী’ নামটি এখনো একটি পরিচিত স্মৃতি। একটি সিনেমা, একটি আলোচিত প্রেম, একটি দাম্পত্য এবং পরবর্তী সময়ে নিভৃতে জীবনযাপন—সব মিলিয়ে তাঁর জীবনকাহিনি বাংলা চলচ্চিত্রের একটি বিশেষ সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
শৈশবের সাধারণ কিছু ছবি থেকে শুরু করে চলচ্চিত্রের আলোয় উঠে আসা, তারপর ব্যক্তিজীবনের নানা বাঁক—রথীর গল্প মূলত সময়ের সঙ্গে একজন তারকার জীবন কীভাবে বদলে যায়, তারই একটি উদাহরণ। আজ পুরোনো ছবিগুলো সামনে এলে তাই শুধু একজন অভিনেত্রীকে নয়, নব্বইয়ের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের একটি হারিয়ে যাওয়া সময়কেও মনে পড়ে যায়।

