টেলিভিশনের পর্দায় ইতিহাস গড়া জনপ্রিয় ফ্যান্টাসি ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘গেম অব থ্রোনস’ দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার সরাসরি বড় পর্দায় পা রাখতে যাচ্ছে।
হলিউডের অন্যতম শীর্ষ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্নার ব্রাদার্স সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘গেম অব থ্রোনস: এগন্স কনকোয়েস্ট’ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে।
শুধু ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ না থেকে সিনেমাটির বিশ্বব্যাপী মুক্তির জন্য ২০২৯ সালের ১ জুন তারিখটি নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে সিনেমাকনের মঞ্চে এই প্রকল্পটির প্রাথমিক ইঙ্গিত দেওয়া হলেও মুক্তির চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটি তাদের ফ্র্যাঞ্চাইজি সম্প্রসারণের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক কৌশলের আনুষ্ঠানিক প্রতিফলন ঘটাল। এর ফলে ছোট পর্দার গণ্ডি পেরিয়ে ফ্যান্টাসি ঘরানার এই বিশাল কল্পজগত এবার বৈশ্বিক বক্স অফিসে নতুন এক প্রতিযোগিতার সূচনা করতে যাচ্ছে।
নতুন এই চলচ্চিত্রের গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে লেখক জর্জ আর আর মার্টিনের মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘আ সং অব আইস অ্যান্ড ফায়ার’ এর প্রারম্ভিক ইতিহাস।
ওয়েস্টেরস মহাদেশে টারগারিয়েন রাজবংশের শাসন কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং রাজা প্রথম এগন কীভাবে সম্পূর্ণ সাম্রাজ্য জয় করে বিখ্যাত আয়রন থ্রোন নির্মাণ করেছিলেন, সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটিই এখানে তুলে ধরা হবে।
মূলত গেম অব থ্রোনসের মূল সিরিজের শত শত বছর আগের এই ঘটনাগুলো অত্যন্ত বিশাল ক্যানভাসের এবং দৃশ্যগত দিক থেকে অত্যন্ত জমকালো। বিশ্লেষকদের মতে ড্রাগনদের যুদ্ধ এবং রাজত্ব দখলের এই বিশাল ব্যাপ্তিকে ছোট পর্দার বাজেটে ফুটিয়ে তোলার চেয়ে বড় পর্দার বিশাল পরিসরে উপস্থাপন করাই বাণিজ্যিকভাবে বেশি যৌক্তিক এবং ঠিক সেই সুযোগটিই কাজে লাগাতে চাইছে ওয়ার্নার ব্রাদার্স।
চলচ্চিত্রটির নির্মাণ ও চিত্রনাট্যের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিনোদন জগতের অত্যন্ত অভিজ্ঞ দুই ব্যক্তিত্বের কাঁধে। পরিচালনার দায়িত্বে থাকছেন ওয়েন হ্যারিস যিনি এর আগে ‘ব্ল্যাক মিরর’ এবং ‘মিসেস ডেভিস’ এর মতো জনপ্রিয় সিরিজে কাজ করেছেন এবং গেম অব থ্রোনসের অপর স্পিনঅফ ‘আ নাইট অব দ্য সেভেন কিংডমস’ এর নির্মাণেও যুক্ত রয়েছেন।
অন্যদিকে চিত্রনাট্য রচনার ভার পড়েছে ‘হাউস অব কার্ডস’ খ্যাত নির্মাতা এবং ‘স্টার ওয়ার্স’ ফ্র্যাঞ্চাইজির সাড়া জাগানো সিরিজ ‘অ্যান্ডর’ এর অন্যতম লেখক বিউ উইলিমন এর ওপর।
রাজনৈতিক কূটচাল এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নির্ভর গল্প বলায় উইলিমনের মুন্সিয়ানা ওয়েস্টেরসের আদিম ক্ষমতার লড়াইকে আরও বাস্তবসম্মত ও আকর্ষণীয় করে তুলবে বলে বিনোদন বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
গেম অব থ্রোনসকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরের এই প্রচেষ্টা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় ২০১৩ সালের দিকে মূল সিরিজের নির্মাতা ডেভিড বেনিওফ এবং ড্যান ওয়েইস টেলিভিশন সিরিজের সমাপ্তি টানার জন্য তিনটি বড় বাজেটের সিনেমা নির্মাণের প্রস্তাব রেখেছিলেন।
কিন্তু সম্প্রচারকারী নেটওয়ার্ক এইচবিও তাদের সাবস্ক্রিপশন ভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেল ঠিক রাখতে সিনেমা নির্মাণের বদলে টেলিভিশন পর্দাতেই আট সিজনের মাধ্যমে সিরিজের ইতি টানে। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে মূল সিরিজ শেষ হওয়ার পর ফ্র্যাঞ্চাইজিটিকে বাঁচিয়ে রাখতে ‘হাউস অব দ্য ড্রাগন’ এবং ‘আ নাইট অব দ্য সেভেন কিংডমস’ এর মতো প্রিকুয়েল সিরিজগুলো টেলিভিশনের জন্য নির্মাণ করা হয়।
তবে বর্তমান স্ট্রিমিং ও থিয়েট্রিক্যাল বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতার মাঝে বৈশ্বিক দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে ফিরিয়ে আনতে এই ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টিকে বড় পর্দায় আনার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে স্টুডিওটি।
বড় পর্দায় এই মহাকাব্যিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে সময়সীমা এবং গল্পের গভীরতাকে। স্বয়ং লেখক জর্জ আর আর মার্টিন ২০১৫ সালে এক সাক্ষাৎকারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে চলচ্চিত্রের দুই বা তিন ঘণ্টার নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তার বইয়ের বিশাল পরিধি এবং চরিত্রগুলোর মানসিক বিকাশ নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা প্রায় অসম্ভব।
তার মতে সময়ের অভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাবপ্লট বাদ পড়ে যেতে পারে এবং পুরো গল্পটি শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় কয়েকটি জনপ্রিয় চরিত্রকে ঘিরেই আবর্তিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে বিউ উইলিমন কীভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ এবং সন্তোষজনক চিত্রনাট্য তৈরি করেন সেটিই এখন এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সব ধরনের জল্পনা ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে গেম অব থ্রোনসের এই নতুন অধ্যায় বক্স অফিসে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে সেটি নির্ভর করবে এর নির্মাণশৈলী এবং দর্শক সংযোগের ওপর।
আয়রন থ্রোনের উৎপত্তি এবং রাজা এগনের মহাকাব্যিক বিজয়ের গল্প বড় পর্দার উপযোগী ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস এবং রাজনৈতিক নাটকীয়তার মাধ্যমে সফলভাবে উপস্থাপিত হলে এটি ফ্যান্টাসি সিনেমার বাজারে নতুন এক মানদণ্ড তৈরি করতে সক্ষম হবে।
পাশাপাশি টেলিভিশন থেকে সরাসরি রূপালি পর্দায় কোনো প্রিমিয়াম ফ্র্যাঞ্চাইজির সফল রূপান্তর হলিউডের অন্যান্য স্টুডিওগুলোর জন্যও অনুকরণীয় কৌশল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ওয়েস্টেরসের এই নতুন ইতিহাস দর্শকদের কতটা আলোড়িত করবে তা দেখার জন্য এখন বিশ্ববাসীকে ২০২৯ সালের গ্রীষ্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

