প্যারিস ফ্যাশন উইকের ঝলমলে ছবি নিজের ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেছিলেন তিনি। এর কয়েক দিন পরেই হারিয়ে গেলেন। আর তিন দিনের মাথায় হংকংয়ের একটি গ্রামের ভাড়া বাসা থেকে পুলিশ যা উদ্ধার করল, তা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল পুরো শহর। সেই ঘটনার তিন বছরেরও বেশি সময় পর হংকংয়ের হাইকোর্টে শুরু হয়েছে মডেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব অ্যাবি চোই হত্যার বিচার। আদালতে কৌঁসুলিরা এমন সব তথ্য তুলে ধরছেন, যা আবার নাড়া দিয়েছে বিশ্বজুড়ে।
ঝলমলে পর্দার আড়ালের মানুষটি
অ্যাবি চোইয়ের পুরো নাম অ্যাবি চোই টিন ফুং। জন্ম ১৯৯৪ সালে। ধনী পরিবারে বড় হওয়া এই তরুণী মডেলিংয়ে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন। প্যারিস ফ্যাশন উইকে তিনি অংশ নিয়েছেন। ভোগ, হার্পার্স বাজার ও এলের মতো ফ্যাশন প্রকাশনায় তাঁকে দেখা গেছে। মৃত্যুর মাসেই মোনাকোর ফ্যাশন ম্যাগাজিন লোফিসিয়েল মোনাকোর প্রচ্ছদে এসেছিল তাঁর ছবি। ইনস্টাগ্রামে অনুসারী ছিল লাখের বেশি। আদালতে কৌঁসুলিরা বলেছেন, সংখ্যাটি প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার। হংকংয়ের গণমাধ্যমের হিসাবে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদের মূল্য ছিল ১০ কোটি হংকং ডলারেরও বেশি।
তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল ঘটনাবহুল। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন অ্যালেক্স কোংকে। তাঁদের দুই সন্তান হয়। পরে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এরপর অ্যাবি বিয়ে করেন ক্রিস ট্যামকে। ক্রিস হংকংয়ের জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ চেইন ট্যামজাই ইউনান মিক্সিয়ানের প্রতিষ্ঠাতার ছেলে। তাঁদেরও দুই সন্তান আছে। অর্থাৎ চার সন্তানের মা ছিলেন অ্যাবি। বিবাহবিচ্ছেদের পরও সাবেক স্বামী ও তাঁর পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতেন বলে আদালতে জানিয়েছেন কৌঁসুলিরা।
২০২৩ সালের সেই তিন দিন
২০২৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজ হন অ্যাবি। তখন তাঁর বয়স ২৮। স্কুল থেকে মেয়েকে নিতে না যাওয়ায় পরিবারের সন্দেহ হয়। সেই খবর পুলিশের কাছে পৌঁছায়। তিন দিন পর, ২৪ ফেব্রুয়ারি, হংকংয়ের নিউ টেরিটরিজের তাই পো এলাকার লুং মেই গ্রামে একটি তিনতলা ভাড়া বাড়ির নিচতলায় অভিযান চালায় পুলিশ। বাসাটি ভাড়া নিয়েছিলেন অ্যাবির সাবেক শ্বশুর। পুলিশ সেখানে যা পায়, তা এই মামলাকে বিশ্বের নজরে নিয়ে আসে।
ফ্রিজ, পাত্র আর ত্রিপলে ঢাকা দেয়াল
পুলিশ জানায়, বাসাটিকে অস্থায়ী কসাইখানা বানানো হয়েছিল। সেখানে ছিল মাংস কাটার যন্ত্র, বৈদ্যুতিক করাত, হাতুড়ি ও বিভিন্ন ছুরি। ফ্রিজের ভেতর পাওয়া যায় অ্যাবির দুই পা। একটি বড় পাত্রে গাজর ও অন্যান্য সবজির সঙ্গে ছিল তাঁর মাথার খুলি ও কয়েকটি পাঁজরের হাড়। ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়, এগুলো অ্যাবিরই দেহাবশেষ। তাঁর ধড় ও হাত সেখানে পাওয়া যায়নি। তদন্তকারীরা ধারণা করেন, সেগুলো অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বাসার ভেতর অ্যাবির পরিচয়পত্র ও ক্রেডিট কার্ডও পাওয়া যায়।
পুলিশ আরও জানায়, দেয়াল ত্রিপল দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছিল। রক্তের দাগ এড়াতে সন্দেহভাজনরা মুখঢাকা সরঞ্জাম ও রেইনকোট ব্যবহার করেছিল। পরে তদন্তকারীরা জানান, অ্যাবির সাবেক ভাশুরের গাড়িতে পাওয়া রক্তের দাগের সঙ্গে অ্যাবির ডিএনএ মিলে গেছে। বাসা থেকে জব্দ করা ত্রিশটির বেশি জিনিসও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।
হংকংয়ে সহিংস অপরাধের হার বিশ্বের অন্যতম কম। তাই ঘটনাটি শহরের মানুষকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়।
গ্রেপ্তার ও মামলা
উদ্ধারের কয়েক দিনের মধ্যেই গ্রেপ্তার শুরু হয়। ব্রিটিশ সংবাদপত্র ডেইলি টেলিগ্রাফ তখন জানিয়েছিল, পুলিশ অ্যাবির সাবেক শ্বশুর ও সাবেক ভাশুরের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ আনে। সাবেক শাশুড়ির বিরুদ্ধে আনা হয় ন্যায়বিচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ। সাবেক স্বামী অ্যালেক্স কোংকে গ্রেপ্তার করা হয় একটু পরে। শেষ পর্যন্ত মোট ছয়জন সন্দেহভাজন আদালতে হাজির হন। এখন খুনের মামলায় বিচার চলছে তিনজনের। তাঁরা হলেন সাবেক স্বামী ও তাঁর বাবা এবং ভাইয়ের।
একটি ফ্ল্যাট, কোটি টাকার ক্ষোভ
কৌঁসুলিদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই হত্যার মূলে ছিল একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাটটি হো ম্যান টিন এলাকার কাদুরিয়া আবাসিক প্রকল্পে। ২০১৯ সালে অ্যাবি সেটি কিনেছিলেন ৬ কোটি হংকং ডলারে। সাম্প্রতিক বাজারমূল্য ছিল ৭ কোটি ২০ লাখ হংকং ডলার, যা প্রায় ৯২ লাখ মার্কিন ডলারের সমান। একাধিক সম্পত্তির মালিকদের ওপর উচ্চ স্ট্যাম্প ডিউটি এড়াতে তিনি ফ্ল্যাটটি সাবেক শ্বশুর কোং কাউয়ের নামে নিবন্ধন করেন। আরেকটি কারণও ছিল। তাঁর সন্তানেরা যেন দাদা ও দাদির কাছে সহজে যত্ন পায়।
২০২২ সালে অ্যাবি ফ্ল্যাটটি বিক্রি করতে চান। এখান থেকেই সম্পর্কে ফাটল ধরে। কৌঁসুলিরা আদালতকে জানান, অ্যাবি বারবার কোং কাউকে ফ্ল্যাট ছাড়তে এবং বিক্রির জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নিতে সই করতে বলেন। কোং কাউ প্রতিবারই রাজি হননি। শেষে অ্যাবি তাঁকে ফ্ল্যাট থেকে বের করে দেন। কৌঁসুলিদের দাবি, এতে কোং কাউ প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। অ্যাবির বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভ জমতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তিনি দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে অ্যাবিকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
আদালতে অ্যাবির নিজের কণ্ঠও শোনানো হয়েছে। মাকে পাঠানো ব্যক্তিগত অডিও বার্তায় তিনি জানিয়েছিলেন, ওই ফ্ল্যাটের পেছনে বিপুল অর্থ খরচ হয়েছে, আর সেই অর্থ খরচ হয়েছে ওই পরিবারের জন্যই। বার্তায় সাবেক শ্বশুরবাড়ির আচরণ নিয়ে তাঁর গভীর ক্ষোভও ফুটে ওঠে।
আদালতে প্রথম দিনগুলো
বিচারের প্রথম শুনানি হয় ২১ সেপ্টেম্বর, সোমবার। সেদিন আদালত প্রাঙ্গণে ভিড় জমান প্রায় একশো মানুষ। আগ্রহী মানুষের জন্য অন্য তলায় সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। তিন আসামি মুখে মাস্ক পরে আইনজীবীদের সঙ্গে আদালতে ঢোকেন। দর্শকের আসনে ছিলেন অ্যাবির বাবাও।
সেদিন বিচারক দুটি কড়া নির্দেশ দেন। প্রথমত, জুরি শপথ নেওয়ার আগের কার্যক্রম মামলা শেষ হওয়ার আগে প্রকাশ করা যাবে না। বিচার যেন প্রভাবিত না হয়, সে জন্যই এই নির্দেশ। দ্বিতীয়ত, অ্যাবির চার সন্তানের নাম, ছবি, ঠিকানা বা পরিচয় প্রকাশে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এই দুই নির্দেশ ভাঙলে আদালত অবমাননার দায়ে পড়তে হতে পারে।
এরপর গঠন হয় জুরিবোর্ড। তাতে আছেন নয়জন। আটজন পুরুষ ও একজন নারী। সেই জুরির সামনেই ৩০ সেপ্টেম্বর, বুধবার বিকেলে শুরু হয় প্রকৃত বিচার।
দোষ স্বীকার, আবার অস্বীকারও
জুরি গঠনের পর মামলায় এক নতুন মোড় আসে। দক্ষিণ চীন মর্নিং পোস্ট জানিয়েছে, ৩১ বছর বয়সী অ্যালেক্স কোং এবং তাঁর ৩৫ বছর বয়সী বড় ভাই অ্যান্থনি কোং আদালতে একটি অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছেন। অভিযোগটি হলো, ২১ থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে অ্যাবির মরদেহের আইনসম্মত ও মর্যাদাপূর্ণ সৎকার ঠেকানো। তাঁদের বাবা ৬৮ বছর বয়সী কোং কাউ এই অভিযোগেও নিজেকে নির্দোষ বলেছেন। তবে খুনের অভিযোগ তিনজনই অস্বীকার করেছেন। ফলে খুনের প্রশ্নে এখন তিনজনকেই লড়তে হবে জুরির সামনে।
কৌঁসুলির অভিযোগ: তিনজন মিলেই করেছেন
সরকারপক্ষের মামলা পরিচালনা করছেন বরিষ্ঠ আইনজীবী শার্লট ড্রেকট। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি মামলাটিকে চাঞ্চল্যকর বলে উল্লেখ করেন। তিনি জুরিদের বলেন, তিনজন একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়েই কাজটি করেছেন। তাঁর যুক্তি, আসলে কে আঘাত করেছেন, তা বড় প্রশ্ন নয়, কারণ তিনজন যৌথভাবে কাজ করেছেন। আইনি পরিভাষায় একে যৌথ দায়ের নীতি বলা হয়।
তিনি আদালতকে জানান, এই ঘটনায় একজনের একরকম, আরেকজনের আরেকরকম ভূমিকা ছিল। বাসা ভাড়া, যন্ত্রপাতি জোগাড়, অ্যাবিকে হত্যা এবং দেহ লুকানোর চেষ্টা, সবই ছিল ওই পরিকল্পনার অংশ। সরকারপক্ষের বক্তব্য শুক্রবারও চলেছে।
আসামিদের পক্ষে লড়ছেন তিন অভিজ্ঞ ব্যারিস্টার। কোং কাউয়ের পক্ষে অলিভার ডেভিস, অ্যালেক্স কোংয়ের পক্ষে অ্যান্ড্রু র্যাফেল এবং অ্যান্থনি কোংয়ের পক্ষে ট্রেভর বিল। বিচারকাজ চলছে ইংরেজি ভাষায়। বিচারক ডেপুটি হাইকোর্ট জাজ ব্রায়ান কিথ।
আইনি প্রক্রিয়া এখন কোন পথে
হংকংয়ের আইনে খুনের মামলার বিচার হয় হাইকোর্টে, জুরির সামনে। এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ আছে। প্রথমটি খুন। দ্বিতীয়টি মরদেহের আইনসম্মত সৎকার ঠেকানো। অভিযোগ অনুযায়ী, লুং মেই গ্রামের ওই বাড়ির নিচতলায় খুন হন অ্যাবি।
প্রক্রিয়ার পরের ধাপগুলো এমন। সরকারপক্ষ প্রথমে নিজেদের অভিযোগ ও প্রমাণের রূপরেখা তুলে ধরছে। এরপর একে একে সাক্ষীরা আদালতে আসবেন। তাঁদের মধ্যে অ্যাবির মা এবং তাঁর বর্তমান শ্বশুরবাড়ির সদস্যরাও আছেন বলে আগেই জানিয়েছিল সরকারপক্ষ। ফরেনসিক ও ডিএনএ প্রতিবেদন এবং জব্দ করা যন্ত্রপাতিও প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। প্রতিপক্ষের আইনজীবীরা সাক্ষীদের জেরা করবেন। আসামিপক্ষও নিজেদের বক্তব্য ও প্রমাণ দেওয়ার সুযোগ পাবে। শেষে বিচারক জুরিদের আইনি দিকনির্দেশনা দেবেন। তারপর জুরিরা আলোচনা করে রায় জানাবেন।
হংকংয়ের আইন অনুযায়ী খুনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে একমাত্র শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবে সেই রায়ের জন্য সরকারপক্ষকে যুক্তিসংগত সন্দেহের ঊর্ধ্বে গিয়ে অভিযোগ প্রমাণ করতে হবে। যতক্ষণ তা প্রমাণিত না হয়, আইনের চোখে তিন আসামি নির্দোষ।
বিচার চলবে প্রায় ৪৫ কর্মদিবস, অর্থাৎ আট সপ্তাহের মতো। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম বলছে, সময় লাগতে পারে ডিসেম্বর পর্যন্ত।

