দক্ষিণ কোরিয়ায় এবারের গরম অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। দেশটিতে আধুনিক পদ্ধতিতে তাপমাত্রা রেকর্ড শুরু হয় ১৯০৪ সালে। সেই রেকর্ডের পর এবারই সর্বোচ্চ তাপমাত্রার দেখা মিলেছে। গত ২ আগস্ট দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইয়াংসানে তাপমাত্রা উঠেছিল ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
এখন দক্ষিণ কোরিয়ায় আলু চাষের মৌসুম চলছে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র তাপপ্রবাহে দেশের কিছু এলাকায় মাটি থেকে আলু তোলার পর কৃষকেরা দেখতে পাচ্ছেন, সেগুলো সেদ্ধ হয়ে যাওয়ার মতো নরম হয়ে গেছে। কোথাও আবার জমি থেকে তোলার আগেই আলু পচে যাচ্ছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক সপ্তাহ আগে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য প্রদেশ গ্যাংওনের কৃষকেরা মাটি খুঁড়ে দেখতে পান, আলুগুলো তোলার মতো অবস্থায় নেই।
উত্তর কোরিয়ার সীমান্তসংলগ্ন ইয়াংগু কাউন্টির হেয়ান এলাকার কৃষক লি সাং-হিউক স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম এসবিএসকে বলেন, ৪০ বছরের কৃষক জীবনে তিনি এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখেননি।
তার ভাষায়, পরিস্থিতি শুধু একটি-দুটি খেতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আশপাশের এলাকায় হাজার হাজার পিয়ং জমির বাঁধাকপির খেতও ‘পুড়ে’ গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার ভূমি পরিমাপের একক পিয়ং। এক পিয়ং প্রায় ৩ দশমিক ৩ বর্গমিটারের সমান।
বাঁধাকপির দাম বাড়ার আশায় কৃষকেরা খেত থেকে ফসল তোলার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে নষ্ট হয়ে যাওয়া বাঁধাকপির মূল্য দাঁড়িয়েছে কয়েক কোটি ওনে। ১ কোটি ওন বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮ লাখ ২২ হাজার ৪৪২ টাকার সমান।
চলতি মাসে প্রথমবারের মতো গ্যাংওন, চুনচন, হোংচন ও হোয়ংসেং শহরে তীব্র তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
শুধু সবজি নয়, ফলের উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরাসরি সূর্যের আলোয় আপেল ‘পুড়ে’ বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের ক্ষতিকে বলা হয় সানস্ক্যাল্ড। একই সঙ্গে অতিরিক্ত গরমে পিচ ফলও ফেটে যাচ্ছে।
তীব্র গরমে কৃষকেরাও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কৃষকদের বক্তব্য, সরকার তাদের ঘরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছে। কিন্তু খেতে থাকা ফসল পচে যাওয়ার কারণে ঘরে থাকার সুযোগ নেই।
কোরিয়ার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ায় তীব্র গরমের কারণে এ পর্যন্ত অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৯ লাখের বেশি গবাদিপশু এবং চাষের ১৪ লাখ মাছ মারা গেছে। মে মাস থেকে তাপজনিত অসুস্থতায় ২ হাজারের বেশি মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ ‘স্টেট অব দ্য ক্লাইমেট ইন এশিয়া’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আগের তিন দশকের তুলনায় গত ৩৫ বছরে এশিয়ায় উষ্ণতা বৃদ্ধির হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট একে ‘জাতীয় বিপর্যয়’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রেও গত জুলাইয়ে তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। গত সোমবার জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ১৮৯৫ সাল থেকে তাপমাত্রার রেকর্ড রাখা হচ্ছে। সেই সময় থেকে হিসাব করলে সদ্য শেষ হওয়া জুলাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উষ্ণ মাস।
এই অতিরিক্ত গরমের প্রভাবে মাসের শেষ দিকে প্যাসিফিক নর্থওয়েস্ট ও কানাডায় বড় ধরনের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে।
জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের ৪৮টি অঙ্গরাজ্যে জুলাইয়ের গড় তাপমাত্রা ২০ শতকের গড়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেশি ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবসৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ এখন আগের তুলনায় আরও তীব্র, দীর্ঘস্থায়ী এবং ঘন ঘন হচ্ছে।
ওয়াইওমিংয়ে জুলাই ছিল সবচেয়ে উষ্ণ। তাপমাত্রার রেকর্ড রাখার পর থেকে অঙ্গরাজ্যটির যেকোনো মাসের মধ্যে এবারই জুলাই সবচেয়ে উষ্ণ ছিল।
গবেষণা ও যোগাযোগবিষয়ক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট সেন্ট্রালের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ২২৯টি শহরে ১৯৭০ সালের পর থেকে জুলাইয়ের তাপমাত্রা গড়ে ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা বেড়েছে প্যাসিফিক নর্থওয়েস্ট ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শহরগুলোতে।
দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোও দ্রুত তীব্র হচ্ছে। এটি বিশ্বজুড়ে সাগর ও বায়ুমণ্ডলের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে।
তবে গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বারবার বয়ে যাওয়া তাপপ্রবাহের সঙ্গে এল নিনোর তুলনায় জলবায়ু পরিবর্তন এবং আবহাওয়া ব্যবস্থার স্বাভাবিক পরিবর্তনশীলতার সম্পর্ক বেশি।
জুলাইয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইউরোপের বিস্তীর্ণ এলাকাতেও একের পর এক তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। এর প্রভাবে জুলাইয়ের শেষ দিকে এবং আগস্টের শুরুতে স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, গ্রিসসহ বিভিন্ন দেশে দাবানল ছড়িয়ে পড়ে।
কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, রেকর্ড রাখা শুরুর পর চলতি গ্রীষ্মের প্রথম দুই মাস পশ্চিম ইউরোপে সবচেয়ে বেশি উষ্ণ ছিল।
আগস্টের শুরুতেও উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে চরম বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। অত্যন্ত শুষ্ক, ঝোড়ো ও গরম আবহাওয়ার মধ্যে গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনের স্পোকেনে তিনটি দাবানলের আগুন একত্র হয়ে শত শত বাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
একই সময়ে চরম তাপ, খরা এবং শীতকালে তুষারপাতের ঘাটতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম জলাধার লেক মিডের পানির স্তর গত সপ্তাহে রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। এই জলাধার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একাধিক অঙ্গরাজ্যের ২ কোটি মানুষের পানির চাহিদা পূরণ করে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনোর প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে মৌসুমি ভারী বৃষ্টিতে বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা বেড়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে ভারতে মৌসুমি বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে ১০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বন্যার পানিতে বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় হাজারো মানুষকে ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়েছে।
কৃষিকাজের জন্য মৌসুমি বৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে এই বৃষ্টি ক্রমেই প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
চলতি বছর ভারতের কয়েকটি রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আসাম। সেখানে অন্তত ৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু শিবসাগর জেলাতেই মারা গেছেন ৪৭ জন।
কেরালায় অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরে তীব্র বৃষ্টিপাতের কারণে অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসেবে বজ্রপাতের ঘটনাও বেড়েছে। ঝাড়খণ্ডে খোলা মাঠে কাজ করার সময় বজ্রপাতে অন্তত ১৪ কৃষিশ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঝাড়খণ্ডে ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এর প্রধান কারণ ছিল ‘বজ্রঝড়’ ও ‘বজ্রপাত’।
এদিকে শ্রীলঙ্কার পূর্বাঞ্চল তীব্র খরার কবলে পড়েছে। কর্তৃপক্ষ ট্যাংকারে করে বাসিন্দাদের জন্য খাবার পানি সরবরাহ করছে। এর মধ্যেই মৌসুমি বন্যায় দেশটিতে অন্তত ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১২ হাজার মানুষ।
গত মাসে শ্রীলঙ্কা সরকার ঘোষণা করেছিল, এ বছরের চরম বৈরী আবহাওয়ার পেছনে এল নিনোর প্রভাব রয়েছে।
মুষলধারে বৃষ্টি, প্রাণঘাতী ভূমিধস এবং আকস্মিক বন্যার কারণে শ্রীলঙ্কার মধ্যাঞ্চলের পার্বত্য এলাকার সব স্কুল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে সরকার।
নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কাও এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি চা উৎপাদনকারী এই অঞ্চল। ওই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ৬৪০ জনের মৃত্যু হয়। এতে আনুমানিক ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছিল।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র জানিয়েছে, বৃষ্টি ও বন্যায় ১২৯টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জাপানেও তীব্র গরমে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ২০ থেকে ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১৮ হাজার ৬০০ মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
দেশটির ফায়ার অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে ৪৫ জনকে হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত ঘোষণা করা হয়।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জাপানের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। দেশটিতে এই তাপমাত্রাকে ‘অত্যন্ত তীব্র গরমের দিন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
টোকিওর সবচেয়ে বড় চিড়িয়াখানা তামা জুলজিক্যাল পার্কেও তীব্র গরমের প্রভাব পড়েছে। গত মঙ্গলবার মুগি নামে তিন বছর বয়সী একটি সিংহী মারা যায়। এর আগে শুক্রবার ১১ বছর বয়সী ইচিগো নামে আরেকটি সিংহী এবং রোববার ১৫ বছর বয়সী লুয়েনা নামে তৃতীয় একটি সিংহীর মৃত্যু হয়।
চিড়িয়াখানার এক মুখপাত্র বলেন, পশুচিকিৎসকের ধারণা অনুযায়ী তাদের মৃত্যুর কারণ হিটস্ট্রোক।
ইউরোপের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শেষ দিক ও জুনে তাপপ্রবাহের কারণে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও স্পেনের কিছু এলাকায় দৈনিক গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত বেশি ছিল।
জুনে পশ্চিম ইউরোপের গড় তাপমাত্রা ছিল ২০ দশমিক ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৬৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট। ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের গড়ের তুলনায় এটি ৩ দশমিক ০৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৫ দশমিক ৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেশি।
কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক ওপরে উঠে যাওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী খরা, ধ্বংসাত্মক দাবানল এবং নদ-নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ার ঘটনা আর বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। বরং এগুলো ইউরোপের গ্রীষ্মের নিয়মিত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের হিসাবে, গত বছর অন্তত ১০ লাখ হেক্টর বা ২৫ লাখ একর জমি পুড়ে গেছে।
তাপপ্রবাহ ইউরোপের পানিসম্পদের ওপরও ব্যাপক চাপ তৈরি করেছে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে নদী, হ্রদ ও জলাধার থেকে বাষ্পীভবন বেড়ে যায় এবং মাটির আর্দ্রতা কমে যায়। একই সঙ্গে পাহাড়ি অঞ্চলের তুষারস্তর বসন্তেই আগেভাগে গলে যায়। ফলে বছরের সবচেয়ে উষ্ণ মাসগুলোতে পানির প্রাপ্যতা কমে যায়।
সাম্প্রতিক গ্রীষ্মগুলোতে রাইন, পো ও দানিউবের মতো নদীগুলোর পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। এর ফলে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়েছে, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে এবং নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল শিল্পকারখানার কার্যক্রমও হুমকির মুখে পড়েছে।
মে মাসে ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ও ইউরোপীয় কমিশন গবেষণা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পূর্বাভাস দিয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপের কৃষিতে বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে কিছু অঞ্চলে এরই মধ্যে পানির ব্যবহার সীমিত করা হচ্ছে।
শুধু পরিবেশগত সংকটই নয়, বাড়ছে অর্থনৈতিক ব্যয়ও। ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থার হিসাবে, ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত চরম বৈরী আবহাওয়ার কারণে ইউরোপে ৭৩৮ বিলিয়ন ইউরোর ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে গত তিন বছরেই ক্ষতি হয়েছে অন্তত ১৬২ বিলিয়ন ইউরো।
সংস্থাটির পূর্বাভাস বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপের অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ ৫ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ইউরোর বা ৬ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। এই ক্ষতির প্রভাব অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই পড়বে।
এদিকে এল নিনোও নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অতীতে দেখা এল নিনোর প্রভাবের তুলনায় এবার এর প্রভাব বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গতকাল সিএনএন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসনের পূর্বাভাস উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এই ঝুঁকি প্রায় ৭০ শতাংশ।
এল নিনোর তীব্রতার কারণে এ যাবৎকালের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৬ সালও সবচেয়ে উষ্ণ বছরের রেকর্ড গড়তে পারে।
তাপপ্রবাহের প্রভাব থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। গত মাসে জার্মানিভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলফি গ্লোবাল প্রকাশিত ‘হিট, হেলথ অ্যান্ড দ্য ইনক্রিজিং কস্টস অব লিভিং—আ কল ফর অ্যাকশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশকে শুধু আরও উষ্ণই করে তুলছে না, লাখ লাখ পরিবারকে আরও গভীর আর্থিক সংকটের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে বাংলাদেশে শ্রমিকদের আয় কমছে। একই সঙ্গে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়।
আটটি দেশের ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় বাংলাদেশ, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার তথ্য প্রথমবারের মতো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকেরা তাপজনিত কারণে বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭৫ কর্মদিবস হারাতে পারেন। বর্তমানে এসব খাতে কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০৩০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
একই সময়ে দেশের সব খাত মিলিয়ে কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ হতে পারে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন। কারণ তাদের অসুস্থতাজনিত ছুটি, স্বাস্থ্যবিমা বা আয় সুরক্ষার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে জানিয়েছে, চলতি মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে একটি বা দুটি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো এলাকার তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তা মৃদু তাপপ্রবাহ এবং ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে মাঝারি তাপপ্রবাহ হিসেবে বিবেচিত হয়।

