মুরগি ধরে খাওয়ার অপবাদেই সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত খ্যাঁকশিয়াল। কিন্তু নতুন এক গবেষণা বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা—কৃষিজমি সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সামলাতে এই ছোট প্রাণীটির ভূমিকা আসলে অনেকটাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নগরায়ণের চাপ, বনভূমি বিলুপ্তি ও মানুষের অকারণ নিধনের কারণে দিন দিন বিপন্ন হয়ে পড়ছে এই প্রজাতি।
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্ত জেলা পঞ্চগড়ের একটি নিভৃত কবরস্থানে দীর্ঘ তিন মাস ধরে ক্যামেরা-ট্র্যাপ পেতে বসে ছিলেন একদল গবেষক। লক্ষ্য ছিল একটাই—রহস্যাবৃত ‘বেঙ্গল ফক্স’ বা বাংলা খ্যাঁকশিয়ালের দৈনন্দিন জীবন কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা। স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরায় ধরা পড়া সেই ফুটেজে উঠে এসেছে খ্যাঁকশিয়ালের পারিবারিক জীবন, বিরোধ, শিকার এবং টিকে থাকার সংগ্রামের এক চমকপ্রদ গল্প। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে খ্যাঁকশিয়াল সম্পর্কে এমন অনেক তথ্য, যা এর আগে কখনো জানা যায়নি।
খ্যাঁকশিয়াল আকারে ছোট, মাংসাশী একটি প্রাণী—ওজন মাত্র দুই কেজির মতো, দৈর্ঘ্যেও বেশ ছোট। খড়রঙা শরীর আর লোমশ লেজ এই প্রাণীর অন্যতম সৌন্দর্য। একসময় দেশের সবখানে দেখা গেলেও এখন এদের অবস্থান বেশ ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে চলে গেছে—আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার লাল তালিকায় বাংলাদেশে এই প্রজাতি ‘বিপদাপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তরাঞ্চলের খোলা তৃণভূমি ও শুষ্ক এলাকা—যা খ্যাঁকশিয়ালের পছন্দের আবাস—দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। ঘনঘন বন্যায় মাটির নিচের গর্ত ডুবে যাওয়ার ঘটনাও প্রজননকালে শাবকদের জন্য বাড়তি বিপদ তৈরি করছে। মূলত পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর পশ্চিম দিকেই এখন এই প্রাণীর উপস্থিতি নথিবদ্ধ হচ্ছে, যেখানে আবাসস্থল ধ্বংস ও মানুষের বিরূপ আচরণের কারণে তারা প্রায় লোকচক্ষুর বাইরে টিকে আছে।
গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে, একটি খ্যাঁকশিয়ালের গর্তকে ঘিরে। মোট বারো ঘণ্টার বেশি ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে গবেষকরা সংগ্রহ করেছেন সাড়ে চার হাজারের বেশি ভিডিও ক্লিপ। গবেষণায় সংশ্লিষ্ট ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন গবেষক এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রেইরি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন অধ্যাপক। খ্যাঁকশিয়ালের গর্তকেন্দ্রিক আচরণ, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং সহাবস্থান নিয়ে এই গবেষণাপত্রটি চলতি বছরের এপ্রিলে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেশ-বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বন বিভাগের একজন উপপ্রধান বন সংরক্ষক বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বনজঙ্গল কেটে মানুষের বসতি তৈরি হওয়ায় খ্যাঁকশিয়ালের আবাসস্থল দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে, যা প্রকৃতির ভারসাম্যের জন্য উদ্বেগজনক। তবে তিনি স্বীকার করেন, এই প্রাণী রক্ষায় বন বিভাগের এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকল্প নেই, যদিও একটি প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, খ্যাঁকশিয়াল তাদের গর্তের প্রতি অত্যন্ত অনুগত। প্রজনন মৌসুমে, বিশেষ করে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে, গর্তের আশপাশে তাদের সক্রিয়তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে, যা শাবক বড় হতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে মে মাসে কমে আসে। একটি গর্তে সর্বোচ্চ ছয়টি পর্যন্ত খ্যাঁকশিয়াল একসঙ্গে দেখা গেছে, এবং তারা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে ভোর ও গোধূলির সময়—যা মূলত অন্য শিকারি প্রাণী ও মানুষের উপস্থিতি এড়ানোর একটি কৌশল হতে পারে।
গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, খ্যাঁকশিয়াল একজন দক্ষ ও সুযোগসন্ধানী শিকারি। পাঁচশর বেশি ভিডিওতে খাদ্যগ্রহণের দৃশ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের খাদ্যতালিকার একটি বড় অংশ পোকামাকড়, তারপর ছোট পাখি এবং ইঁদুর। শাবক পালনের সময় বড়রা পাখির মতো ওজনদার শিকার বেশি আনে, যাতে শাবকদের পুষ্টি নিশ্চিত হয়। উল্লেখ্য, এই নির্দিষ্ট গবেষণায় সাপ বা মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার খাওয়ার কোনো প্রমাণ মেলেনি, যদিও ভারতের একটি অঞ্চলে ভিন্ন চিত্র দেখা গিয়েছিল।
সাধারণত একাকী থাকতে পছন্দ করলেও শাবক পালনের সময় খ্যাঁকশিয়াল দম্পতি বেশ সামাজিক হয়ে ওঠে। গবেষণায় ষোলো ধরনের আচরণের মধ্যে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আচরণ চিহ্নিত হয়েছে, যার মধ্যে খেলাধুলাই সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা গেছে। এছাড়া একে অপরকে অভিবাদন জানানো, শরীর পরিষ্কার করে দেওয়া এবং শাবকদের দুধ খাওয়ানোর দৃশ্যও ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। গবেষকদের মতে, এই খেলাধুলা শাবকদের মধ্যে সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলার পাশাপাশি ভবিষ্যতে শিকার বা আত্মরক্ষার দক্ষতা অর্জনেও সহায়ক।
গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো খ্যাঁকশিয়ালের গর্তে বাংলা গুইসাপের নিয়মিত আনাগোনা এবং তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। গুইসাপ প্রায়ই খ্যাঁকশিয়াল শাবক শিকার করে, এমন প্রমাণ ভারতের একাধিক গবেষণায়ও মিলেছে। পঞ্চগড়ের ফুটেজে দেখা গেছে, শতাধিক ক্লিপে দুই প্রাণী একসঙ্গে উপস্থিত হয়েছে, যার একটি বড় অংশে খ্যাঁকশিয়াল গুইসাপকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে সতর্ক দূরত্ব বজায় রেখেছে।
গবেষণায় আরও একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, মানুষের চলাচলের সঙ্গে খ্যাঁকশিয়ালের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। গর্তের মাত্র কয়েক মিটার দূরে থাকা পাকা রাস্তা বা ক্যামেরার উপস্থিতিও তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিশেষ প্রভাব ফেলেনি। এ বিষয়ে দেশের একজন পরিচিত বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী মন্তব্য করেন, সরাসরি হুমকি না থাকলে খ্যাঁকশিয়াল মানুষের বসতির কাছেও নির্বিঘ্নে থাকতে পারে, যা প্রমাণ করে সহনশীলতা থাকলে সহাবস্থান সম্ভব।
গবেষক দল মনে করছে, দ্রুত নগরায়ণ ও অসচেতনতার কারণে এই প্রজাতি বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের মতে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সচেতনতাও এখন অত্যন্ত জরুরি। গ্রামের ঝোপঝাড়, ছোট বন বা নির্জন কবরস্থানের মতো জায়গাগুলো রক্ষা করা গেলেই এই প্রাণীর টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়বে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রাণিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ এ বিষয়ে বলেন, উপযুক্ত সুযোগ ও সুরক্ষা পেলে খ্যাঁকশিয়াল মানুষের লোকালয়ের আশপাশেই শান্তিতে বসবাস করতে পারে, এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এই ছোট প্রাণীর ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ইঁদুরের প্রজনন বেড়ে যাওয়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা মোকাবিলায় খ্যাঁকশিয়ালের মতো প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রকদের ভূমিকা তাই আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

