রাঙামাটির বরকল উপজেলার বরুণাছড়িতে বন্য হাতির সঙ্গে মানুষের এক ব্যতিক্রমী সহাবস্থান গড়ে উঠেছে। বাগানে ঢুকে ফল খাওয়া, গাছ ভাঙা কিংবা বাড়ির আশপাশে রাত কাটানোর পরও হাতিকে শত্রু ভাবেন না স্থানীয়রা। হইচই বা আক্রমণের বদলে টর্চের আলো আর শব্দ দিয়ে নিরাপদ দূরত্ব থেকে তারা হাতিকে বনে ফেরান। তবে ক্ষতির ক্ষতিপূরণ ও সরঞ্জামের অভাব এই সহাবস্থানকে চাপে ফেলছে।
চিরসবুজ পাহাড়ি বন আর কাপ্তাই হ্রদ ঘিরে এখানে টিকে আছে এশীয় বন্য হাতির একটি দল। পাহাড়ের ঢালে, কখনো আমলকী, পেয়ারা, কলা বা লিচুবাগানে খাবারের খোঁজে ঘুরে বেড়ায় তারা। বন থেকে বেরিয়ে কখনো লোকালয়েও চলে আসে। হাতি এলে এলাকায় তেমন আতঙ্ক দেখা যায় না। হাতি আসে, ঘুরে বেড়ায়, আবার ফিরে যায়।
বরুণাছড়ির বাসিন্দারা দীর্ঘদিনের এই আসা-যাওয়াকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নিয়েছেন। তারা জানেন, বনে খাবারের সংকট হলে হাতি লোকালয়ের কাছাকাছি আসে। প্রয়োজন মিটলে আবার গহিন বনে ফিরে যায়। তাই হাতি দেখামাত্র তাড়িয়ে দেওয়ার বদলে তারা পরিস্থিতি বুঝে তাকে চলাচলের সুযোগ দেন।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে বৃষ্টির এক রাতে একটি হাতি ঘোরাঘুরি করছিল স্থানীয় বাসিন্দা পারভীন বেগমের বাড়ির আশপাশে। তিনি চিৎকার করেননি, তাড়ানোরও চেষ্টা করেননি। অপেক্ষা করেছেন। হাতিটি নিজের মতো খেয়ে একসময় চলে গেছে। পারভীনের মতো অনেকেই ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিয়েও হাতিকে প্রতিপক্ষ নয়, বনের অংশ হিসেবে দেখেন।
সহনশীলতার এই চিত্রের আড়ালে ক্ষতির বাস্তবতাও আছে। পারভীন বেগমের আমলকী ও পেয়ারা গাছ ভেঙেছে হাতি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার পাকঘরও। কখনো বাড়ির দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টাও করেছে। তিনি জানান, খাবারের সংকটে হাতি এলে অনেকক্ষণ সজাগ থাকতে হয়, রাত জেগে পাহারা দিতে হয়। তবে গ্রামে হাতি ঢুকলে সবাই সতর্ক থাকেন, কেউ উত্ত্যক্ত করেন না। টর্চ মারলেই হাতি দূরে সরে যায় বলে জানান তিনি। কখনো সপ্তাহে এক-দুবারও বাড়ির কাছে হাতির উপস্থিতি টের পান তিনি।
একই অভিজ্ঞতা জাফর উদ্দিনের। তার বাগানেও নিয়মিত হাতি আসে। কখনো ফল খেয়ে যায়, কখনো গাছপালা ভেঙে দেয়। হাতি লোকালয়ে এলে টর্চের আলো ও টিন বাজিয়ে নিরাপদে সরানোর চেষ্টা করেন তিনি। দুজনই বন বিভাগে ক্ষতিপূরণের আবেদন করেছেন। কিন্তু এখনো কিছু পাননি বলে জানান তারা।
স্থানীয়রা সাধারণত হাতিকে ঘিরে ধরেন না, খুব কাছেও যান না। দূর থেকে টর্চের আলো ফেলেন, টিন বা ধাতব বস্তু বাজিয়ে শব্দ করেন। প্রয়োজনে ঢোল ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে হাতিকে বনের দিকে ফিরতে সহায়তা করেন। পরিস্থিতি জটিল হলে খবর দেওয়া হয় এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমকে (ইআরটি)।
বরকল ও লংগদু উপজেলার হাতির বিচরণ এলাকায় কাজ করছে ইআরটি। হাতির অবস্থান সম্পর্কে স্থানীয়দের সতর্ক করা, ঝুঁকি কমাতে পরামর্শ দেওয়া এবং লোকালয়ে ঢুকে পড়লে হাতি সরাতে সহায়তা করা তাদের কাজ। ইআরটি সদস্যদের মতে, খাবারের খোঁজে হাতির এভাবে ঘোরাফেরা স্বাভাবিক।
তবে দলটির সদস্য মোহাম্মদ জহাঙ্গীর আলম বাবু জানান, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। বাঁশি, টর্চের মতো সামগ্রীও পর্যাপ্ত নেই। হঠাৎ কাছেই হাতি বাড়িঘর ভাঙলে ছুটে যেতে চাইলেও তাদের হাতে ছাতা, টর্চ বা নৌকা থাকে না। অল্প যা আছে, তা দিয়েই বাদ্যযন্ত্র বা উচ্চ শব্দে হাতি সরানোর চেষ্টা করেন তারা। বাদ্যযন্ত্রসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী যথাযথভাবে পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বরুণাছড়ি এলাকায় ১০ থেকে ১২টি এশীয় বন্য হাতি রয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এ এলাকায় তাদের বিচরণ। পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রফিকুজ্জামান শাহ বলেন, ঠিক কত বছর ধরে হাতিগুলো সেখানে আছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে ১০-১২ বছরেরও আগে থেকে আছে বলে তারা জানেন।
হাতিগুলো অন্য এলাকায় চলে গেছে, এমন কোনো তথ্যও বন বিভাগের কাছে নেই। তিনি জানান, সব হাতি সবসময় একসঙ্গে চলে না। কখনো চার, কখনো ছয় বা আটটি হাতি একসঙ্গে দেখা যায়। তারা বিচ্ছিন্নভাবে চলাচল করে। তাই জরিপ ছাড়া পুরুষ, নারী ও বাচ্চা হাতির সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বলা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্থানীয়রাও একই চিত্র দেন। এলাকায় হাতির চলাচল পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত একজনের ভাষ্য, কখনো পাঁচটি, কখনো চারটি, কখনো তিনটির আলাদা আলাদা দল দেখা যায়।
সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে বরুণাছড়ির একটি লিচুবাগানে হাতির চলাচলের চিহ্ন দেখা যায়। পাহাড়ের ঢাল ও বাগানের নানা জায়গায় ছিল যাতায়াতের ছাপ। লতাপাতা, কলাগাছ ও কচি বাঁশ খেয়ে কিছুক্ষণ কাটানোর পর হাতিগুলো কাপ্তাই হ্রদের দিকে নেমে যায়।
একসময় হাতির আবাসস্থল ছিল আরও বিস্তৃত। পাহাড় কাটা, গাছপালা উজাড়, বনে আগুন ও মানুষের বসতি বাড়ায় তা ক্রমে সংকুচিত হয়েছে। তবু বরুণাছড়ির পাহাড়ি বন, ফলের বাগান ও কাপ্তাই হ্রদ ঘিরে টিকে আছে হাতিগুলো।
একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কেজি খাবার এবং অন্তত ১০০ লিটার পানি লাগে। বরুণাছড়ির বন ও কাছের কাপ্তাই হ্রদ সেই চাহিদার বড় অংশ মেটায়। কিন্তু ঋতু ও খাবারের প্রাপ্যতা অনুযায়ী বনে সংকট দেখা দিলে লোকালয়ের ফলের বাগানই হয়ে ওঠে সহজলভ্য খাদ্যের উৎস। এ কারণেই হাতির লোকালয়ে আসা এখানকার মানুষের কাছে নতুন কিছু নয়।
প্রাণী অধিকারকর্মী রাকিবুল হক এমিলের মতে, বরুণাছড়ির মানুষের সঙ্গে হাতির দীর্ঘদিনের সম্পর্ক স্থানীয়দের মধ্যে একধরনের সহনশীলতা তৈরি করেছে। বন ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপনের কারণে তারা হাতিকে প্রতিপক্ষ নয়, প্রতিবেশী হিসেবে দেখেন। তার ভাষ্য, এখানকার মানুষের হাতির প্রতি সহনশীলতা বাংলাদেশের অন্য অঞ্চল থেকে আলাদা।
তিনি আরও বলেন, মানুষের বসতির ধরন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, হাতির চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়া এবং ক্ষয়ক্ষতির পর মানুষের প্রতিক্রিয়া—এসব বিষয় মানুষ-হাতি সংঘাতের মাত্রা ঠিক করে দেয়।
বনের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। হাতির জন্য বন শুধু আশ্রয় নয়, খাবারের উৎস ও চলাচলের পথও। কাপ্তাই হ্রদ মেটায় পানির চাহিদা। চলার পথে হাতি নানা জায়গায় বীজ ছড়িয়ে দেয়, যা বনের স্বাভাবিক পুনর্জন্মে সহায়তা করে। তাই হাতিকে অনেক সময় ‘ফরেস্ট ইঞ্জিনিয়ার’ বলা হয়।
সহাবস্থান শুধু মানুষের সহনশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোও এর বড় অংশ। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বন্য হাতির কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছ থেকে ৪২টি আবেদন জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে বিধিমালা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জানান, যাচাইয়ের পর আবেদনগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। বরকল এলাকায় বন বিভাগের উদ্যোগে তিনটি ইআরটি কাজ করছে।
হাতির নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে স্থানীয় স্কুলের শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভাও হচ্ছে। হাতি ও তাদের আবাসস্থল রক্ষায় স্থানীয়দের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশে এশীয় হাতি ‘ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জার্ড’ বা অতি বিপন্ন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ। আবাসস্থল সংকোচন, বনভূমিতে মানুষের কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি এবং মানুষ-হাতি সংঘাত তাদের জন্য বড় হুমকি। আইইউসিএনের ২০১৬ সালের জাতীয় হাতি জরিপে দেশে ২৬৮টি আবাসিক বন্য হাতি, ৯৩টি আন্তঃসীমান্তীয় হাতি ও ৯৬টি বন্দী হাতির তথ্য পাওয়া যায়। এরপর দীর্ঘদিন নতুন জরিপ না হওয়ায় বর্তমানে মোট কত হাতি আছে, তা জানতে হালনাগাদ জরিপ প্রয়োজন।
হাতির আবাসস্থল রক্ষা ও মানুষ-হাতি সংঘাত কমাতে সরকার ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘এলিফ্যান্ট কনসারভেশন প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় হাতির খাদ্যোপযোগী বাগান ও বাঁশবাগান তৈরি, জলাধার খনন, ১০ কিলোমিটার বায়োফেন্সিং, ১৬টি ট্রি টাওয়ার, দুটি হাতি উদ্ধারকেন্দ্র এবং আহত হাতির চিকিৎসার জন্য চারটি শেড স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে। এ ছাড়া হাতির করিডোর চিহ্নিত করতে জরিপ, জিপিএস কলার ব্যবহার, ইআরটিকে সহায়তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও প্রকল্পের অংশ।
প্রকল্প পরিচালক এ এস এম জহির উদ্দিন আকনের মতে, খাদ্যসংকট, হাতির চলাচলের পথে প্রতিবন্ধকতা এবং হাতিকে উত্ত্যক্ত করার মতো বিষয় মানুষ-হাতি সংঘাতের পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। এসব কারণ কমানো গেলে সংঘাতও অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তিনি বলেন, শুধু একটি প্রকল্প দিয়ে এই দ্বন্দ্ব পুরোপুরি সমাধান করা যাবে না। হাতি সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি সরাসরি সম্পৃক্ত করতে হবে। মানুষের নিরাপত্তা, ক্ষতিগ্রস্তদের স্বার্থ ও হাতির আবাসস্থল—তিনটি বিষয়ই একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
বরুণাছড়ির অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, মানুষের সহনশীলতা হাতির টিকে থাকার বড় ভরসা। কিন্তু সেই সহনশীলতা টেকসই রাখতে ক্ষতিপূরণ সময়মতো পাওয়া, ইআরটির সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এবং হালনাগাদ জরিপের মতো কাজ জরুরি।

