১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করে। সরকারের যুক্তি ছিল, বিশাল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি কার্যকরভাবে চালাতে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস দরকার। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত ঘিরে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তা দ্রুতই প্রশাসনিক সীমানার প্রশ্ন ছাড়িয়ে রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের বিতর্কে রূপ নেয়। ১১৫ বছরের বেশি সময় পরও প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক। বঙ্গভঙ্গ কি নিছক প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ছিল, নাকি এর পেছনে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক হিসাব-নিকাশও কাজ করেছিল?
ওই দিন বিশাল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ভেঙে গঠিত হয় পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ। এর রাজধানী করা হয় ঢাকাকে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে যায় কলকাতাকেন্দ্রিক প্রশাসনের অধীনে। তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জনের সরকার দাবি করেছিল, বিভাজনের ফলে প্রশাসনিক কাজ আরও কার্যকর হবে এবং পূর্ববঙ্গ ও আসামের প্রতি বেশি মনোযোগ দেওয়া যাবে। লর্ড কার্জন ভারতের ভাইসরয় ছিলেন ১৮৯৯ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত। নতুন প্রদেশ গঠনের ফলে ঢাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।
প্রশাসনিক সমস্যার বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। বেঙ্গলে তখন প্রায় আট কোটি মানুষের বাস। এত বড় জনপদ চালানো ঔপনিবেশিক সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জ ছিল। পূর্ববঙ্গ কলকাতার প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে দূরে হওয়ায় সেখানকার শাসন ও উন্নয়ন নিয়েও নানা প্রশ্ন ছিল। তবে প্রশ্ন হলো, সমস্যা ছিল বলেই কি তার সমাধান হিসেবে নেওয়া সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ছিল?
ঐতিহাসিক জন আর ম্যাকলেন ১৯৬৫ সালের গবেষণাপত্রে সরকারি নথি ও চিঠিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, বঙ্গভঙ্গের প্রাথমিক প্রস্তাবের পেছনে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনাই ছিল। কিন্তু পরিকল্পনা যত এগিয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনাও ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, পুরো বিষয়টিকে জাতীয়তাবাদ দমনের পরিকল্পনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯০৫ সালের আগেই কলকাতা ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেখানকার সংবাদপত্র, রাজনৈতিক সংগঠন ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিভিন্ন অংশ ব্রিটিশ শাসনের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছিল। বঙ্গভঙ্গের ফলে কলকাতাকেন্দ্রিক প্রশাসনিক পরিসর ছোট হয়, আর ঢাকাকে ঘিরে নতুন প্রাদেশিক প্রশাসন গড়ে ওঠে। এতে কলকাতার রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক সুযোগ ও আঞ্চলিক স্বার্থের বিন্যাসেও পরিবর্তন আসে।
ঐতিহাসিক ডেভিড লুডেন এই বিভাজনকে ভূখণ্ড পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর আলোচনায় উঠে এসেছে, নতুন সীমানা আঞ্চলিক রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে কী প্রভাব ফেলেছিল। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, বঙ্গভঙ্গ শুধু প্রশাসনিক সীমানা বদলানো ছিল না। এটি রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক স্বার্থ এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ক্ষেত্রকেও বদলে দিয়েছিল।
নতুন প্রদেশ গঠনের পর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন। কিছু মুসলিম নেতা ও এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নতুন প্রদেশকে স্বাগত জানান। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, ঢাকাকেন্দ্রিক প্রশাসন গড়ে উঠলে শিক্ষা, সরকারি চাকরি ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের সুযোগ বাড়বে।
অন্যদিকে হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণির একটি বড় অংশ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে। শিক্ষিত ও প্রভাবশালী এই শ্রেণির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কলকাতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁদের অনেকের আশঙ্কা ছিল, বিভাজনে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর ঐক্য দুর্বল হবে এবং কলকাতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তবে অনেক ঐতিহাসিকের মতে, এই বিরোধকে শুধু হিন্দু বনাম মুসলমানের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা ঠিক নয়। দুই সম্প্রদায়ের ভেতরেই ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মত, আঞ্চলিক স্বার্থ ও প্রত্যাশা ছিল। বঙ্গভঙ্গের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অর্থ বাঙালি পরিচয় প্রত্যাখ্যান করা নয়। আবার এর বিরোধিতা করলেই সব জনগোষ্ঠীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা হয় না। সেমন্তী ঘোষ তাঁর গ্রন্থে এই জটিলতা বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর আলোচনায় দেখা যায়, বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের জাতীয়তাবাদী চিন্তা একরকম ছিল না। আঞ্চলিক পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় এবং জাতি ও রাষ্ট্র নিয়ে তাঁদের ধারণা ছিল আলাদা।
বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয় বড় হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীদের কাছে বাংলা শুধু একটি প্রশাসনিক অঞ্চল ছিল না। ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি ভূখণ্ড ছিল এটি। তাই স্বদেশি আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ব্রিটিশ পণ্য বর্জন, দেশি পণ্যের ব্যবহার, জনসভা, মিছিল, গান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আন্দোলন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করে। গবেষক সুমিত সরকার তাঁর গ্রন্থে এই আন্দোলনের বিকাশ, সংগঠন ও প্রতিবাদ বিশ্লেষণ করেছেন। পাশাপাশি আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন, সামাজিক সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক লক্ষ্যের পরিবর্তনও তুলে ধরেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আন্দোলনকে ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সূত্রে গেঁথে দেন। তবে এর সীমাবদ্ধতাও ছিল। সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের ওপর জোর দেওয়ায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে বঙ্গভঙ্গ একদিকে ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সংঘাত সামনে আনে, অন্যদিকে বাংলা কার প্রতিনিধিত্ব করবে, সেই প্রশ্নও তুলে ধরে।
কয়েক বছর ধরে চলা আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্তটি বাতিল করে। বাংলার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠিত হয়। একই বছর ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরানোর ঘোষণাও আসে। বঙ্গভঙ্গ রদের ঘটনা দেখিয়ে দেয়, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে উপস্থাপিত একটি সিদ্ধান্ত কীভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। ততদিনে বাংলার সীমানা নির্ধারণের প্রশ্নটি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠেছিল।
সব মিলিয়ে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গকে নিছক প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য আড়ালে থেকে যায়। প্রশাসনিক সমস্যার বাস্তবতা, রাজনৈতিক হিসাব, আঞ্চলিক বৈষম্য, ধর্মীয় পরিচয় ও বিভিন্ন শ্রেণির স্বার্থ, সব মিলিয়েই এর ইতিহাস গড়ে উঠেছে। সাংস্কৃতিক পরিচয় ও জাতীয়তাবাদী চেতনা সিদ্ধান্তটির বিরুদ্ধে আন্দোলনকে বিস্তৃত রাজনৈতিক তাৎপর্য দিয়েছিল। আজকের দিনেও এই ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রীয় সীমানা বা প্রশাসনিক কাঠামো বদলের যেকোনো সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক নয়, তা মানুষের পরিচয়, স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রত্যাশার সঙ্গেও জড়িত।

