বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় যুক্ত হলো মিরপুরে। শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এক ম্যাচ হাতে রেখেই তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ জিতে নিয়েছে বাংলাদেশ। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, অসংখ্য ব্যর্থতা এবং বারবার চেষ্টা শেষে অবশেষে ছয়বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো দ্বিপক্ষীয় ওয়ানডে সিরিজ জয়ের স্বাদ পেল টাইগাররা।
সিরিজের প্রথম ম্যাচে ৮৬ রানের বড় জয় পাওয়ার পর দ্বিতীয় ওয়ানডেতেও আত্মবিশ্বাসী ক্রিকেট খেলেছে বাংলাদেশ। ফলে তৃতীয় ম্যাচের ফলাফলের অপেক্ষা না করেই সিরিজ নিজেদের করে নিয়েছে স্বাগতিকরা। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে।
মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ওয়ানডেতে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় অস্ট্রেলিয়া। তবে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে বড় সংগ্রহ গড়তে পারেনি সফরকারীরা। বৃষ্টির কারণে ম্যাচের ওভার কমে এলেও অস্ট্রেলিয়া ৪২ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৮৭ রান সংগ্রহ করে।
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে সবচেয়ে বড় অবদান আসে মার্নাস লাবুশেনের ব্যাট থেকে। তিনি ৮৫ বলে ৫৫ রান করে অপরাজিত থাকেন। অন্যদিকে জেভিয়ার বার্টলেটও শেষদিকে কার্যকর ব্যাটিং করে ৪৮ বলে ৫২ রান করেন। তবে এই দুজন ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার আর কোনো ব্যাটার বড় ইনিংস খেলতে পারেননি।
বাংলাদেশের বোলাররা শুরু থেকেই চাপ তৈরি করেন। তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান তিনটি করে উইকেট শিকার করে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে বড় সংগ্রহ গড়ার সুযোগ দেননি। এছাড়া তানভির ইসলাম দুটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নিয়ে দলের সাফল্যে অবদান রাখেন।
বৃষ্টির কারণে ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে বাংলাদেশের সামনে ৪১ ওভারে ১৯২ রানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় স্বাগতিকরা। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই ফিরে যান ওপেনার তানজিদ হাসান।
তবে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ান সৌম্য সরকার ও নাজমুল হোসেন শান্ত। দীর্ঘদিন পর জাতীয় দলে ফিরে সৌম্য দারুণ আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিং উপহার দেন। শান্তকে সঙ্গে নিয়ে দ্বিতীয় উইকেটে ৮৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে তোলেন তিনি। এই জুটিই মূলত বাংলাদেশের জয়ের ভিত গড়ে দেয়।
সৌম্য ৪৭ বলে ৪২ রান করে আউট হলেও তার ইনিংস দলের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান ছিল। অন্য প্রান্তে শান্তও দায়িত্বশীল ব্যাটিং করে ৫৩ বলে ৪২ রান করেন। তাদের বিদায়ের পর কিছুটা চাপ তৈরি হলেও লিটন দাস দ্রুত রান তুলে ম্যাচকে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণেই রাখেন। তিনি ১৮ বলে ২১ রান করেন।
শেষদিকে তাওহীদ হৃদয় ও মেহেদি হাসান মিরাজ অসাধারণ পরিপক্বতার পরিচয় দেন। কোনো ঝুঁকি না নিয়ে তারা ম্যাচ শেষ করে মাঠ ছাড়েন। হৃদয় ৪০ এবং মিরাজ ২২ রানে অপরাজিত থাকেন। তাদের ব্যাটেই ৩৬ বল হাতে রেখে ৫ উইকেটের জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।
এই সিরিজ জয় শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রিকেটের অগ্রযাত্রার প্রতীক। ২০০৫ সালে কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের পর দীর্ঘ ২১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে আরেকটি বড় সাফল্যের জন্য। এবার শুধু একটি ম্যাচ নয়, পুরো সিরিজ জিতে দেখিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ এখন বড় দলগুলোর বিপক্ষে ধারাবাহিকভাবে লড়াই করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
বিশেষ করে বোলিং বিভাগ, মধ্যক্রমের ব্যাটিং এবং চাপের মুহূর্তে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা এই সিরিজে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হিসেবে সামনে এসেছে। তরুণ ও অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা দলটি যে সঠিক পথে এগোচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই সিরিজ জয় তারই প্রমাণ।
ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে এই জয় শুধুমাত্র একটি সিরিজ জয়ের আনন্দ নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, বিশ্বাস এবং ভবিষ্যতের আরও বড় স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণাও বটে। মিরপুরের এই সাফল্য তাই দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে। :::

