আজকের বাংলাদেশে ফুটবল নিয়ে আবেগের কোনো অভাব নেই। বিশ্বকাপ এলেই দেশের অলিগলি থেকে শুরু করে শহরের বহুতল ভবন পর্যন্ত ভরে যায় আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল কিংবা অন্য দেশের পতাকায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে তর্ক-বিতর্ক, কখনো কখনো সেই উন্মাদনা সহিংসতাতেও রূপ নেয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন খুব কমই সামনে আসে—যে দেশের মানুষ বিদেশি দল নিয়ে এত আবেগী, সেই দেশের নিজের ফুটবলের ইতিহাস কতটা জানা আছে?
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাস শুধু পুরোনো নয়, গৌরবময়ও। এমন বহু অধ্যায় রয়েছে, যা আজকের প্রজন্মের বড় অংশের কাছেই প্রায় অজানা। অথচ একসময় এই ভূখণ্ডেই ফুটবল ছিল আত্মমর্যাদা, প্রতিরোধ এবং জাতীয় চেতনার অন্যতম প্রতীক।
এক ম্যাচ, যা ইতিহাসে জায়গা পাওয়ার কথা ছিল
১৯৩৭ সালের ২১ নভেম্বর ঢাকার একটি মাঠে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা আজও ফুটবল ইতিহাসে অনন্য হয়ে থাকতে পারত।
সেই সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফর করে বেড়ানো শক্তিশালী ইংরেজ ক্লাব আইসলিংটন কোরিন্থিয়ান্স ভারতীয় উপমহাদেশেও একের পর এক ম্যাচ জিতছিল। কলকাতার শক্তিশালী দলগুলোকেও তারা সহজেই পরাজিত করেছিল। পুরো সফরে তারা প্রায় অপরাজেয় ছিল।
কিন্তু ঢাকার মাঠে এসে সেই অপ্রতিরোধ্য দলটি থমকে যায়।
ঢাকার একাদশের হয়ে একমাত্র গোলটি করেছিলেন ভূপেন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত, যিনি ‘পাখি সেন’ নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। সেই একটিমাত্র গোলই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়। ইংরেজ দলটি পুরো ভারত সফরে আর কোথাও হারেনি। একমাত্র পরাজয় এসেছিল ঢাকার কাছে।
এই জয় শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের ফল ছিল না। উপনিবেশিক শাসনের সময়ে এটি ছিল আত্মবিশ্বাসের এক প্রতীক, যেখানে শাসিত মানুষ শাসকের খেলাতেই তাকে হারিয়ে দিয়েছিল।
ফুটবল যখন আত্মপরিচয়ের অংশ
ফুটবল এই অঞ্চলে এসেছিল ব্রিটিশদের হাত ধরে। উদ্দেশ্য ছিল খেলাধুলার মাধ্যমে উপনিবেশিক সমাজে তাদের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা।
কিন্তু খুব দ্রুতই বাঙালিরা এই খেলাকে নিজেদের মতো করে গ্রহণ করে।
কলকাতাকে কেন্দ্র করে ফুটবলের বিকাশ ঘটলেও পূর্ববঙ্গও খুব দ্রুত শক্তিশালী ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে তোলে। ঢাকা, ময়মনসিংহ, রংপুর ও চট্টগ্রামে গড়ে ওঠে অসংখ্য ক্লাব, স্থানীয় প্রতিযোগিতা এবং প্রতিভাবান খেলোয়াড়।
ফুটবল ধীরে ধীরে শুধু বিনোদনের বিষয় ছিল না; এটি হয়ে ওঠে আত্মসম্মান, সামাজিক পরিচয় এবং সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ।
পূর্ব বাংলার ফুটবল শক্তি
বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্লাবগুলোর একটি ছিল ওয়ারী ক্লাব।
১৮৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাব একের পর এক শক্তিশালী দলকে হারিয়ে আলোচনায় আসে। কলকাতার বড় ক্লাবগুলোর পাশাপাশি বিদেশি দলগুলোর বিরুদ্ধেও তারা দুর্দান্ত লড়াই করেছে।
পরে ঢাকা শহরে গড়ে ওঠে আরও বহু ক্লাব। স্কুলভিত্তিক প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক টুর্নামেন্ট এবং স্থানীয় লীগ মিলিয়ে ফুটবল হয়ে ওঠে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
এই সময়েই উঠে আসেন কিংবদন্তি সৈয়দ আব্দুস সামাদ, যিনি ‘ফুটবল জাদুকর’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেও জীবনের শেষভাগ কাটিয়েছেন অনেকটাই নীরবে।

দেশভাগ বদলে দেয় বাস্তবতা
১৯৪৭ সালের দেশভাগ শুধু ভূখণ্ড নয়, বদলে দেয় ফুটবলের মানচিত্রও।
পূর্ব পাকিস্তানে ফুটবলের জনপ্রিয়তা ও মান ছিল অত্যন্ত উঁচু। ঢাকার প্রথম বিভাগ লীগকে অনেকেই সে সময় পশ্চিম পাকিস্তানের যেকোনো প্রতিযোগিতার চেয়ে শক্তিশালী মনে করতেন।
তবুও জাতীয় দলে পূর্ব পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের সুযোগ ছিল খুবই সীমিত।
এই বৈষম্য খেলাধুলার মধ্যেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্যের প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধে ফুটবলের ভূমিকা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসেও ফুটবল এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৭১ সালে গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। তারা শুধু খেলতে মাঠে নামেনি; খেলাকে ব্যবহার করেছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা এবং অর্থ সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে।
ভারতের বিভিন্ন শহরে ম্যাচ খেলে তারা মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে। প্রতিটি ম্যাচ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে এক ধরনের কূটনৈতিক বার্তা।
খেলোয়াড়দের অনেকেই পরে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন।
এটি বিশ্বের ক্রীড়া ইতিহাসেও বিরল এক ঘটনা।
স্বাধীনতার পর সোনালি সময়
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ফুটবল দ্রুত নতুন উচ্চতায় পৌঁছে।
আবাহনী ও মোহামেডানের দ্বৈরথ দেশের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিণত হয়। স্টেডিয়ামে হাজার হাজার দর্শকের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত ঘটনা।
আশির দশককে বাংলাদেশের ফুটবলের স্বর্ণযুগ বলা হয়। বড় বড় ম্যাচের টিকিট পাওয়া ছিল কঠিন। ফুটবলাররাও ছিলেন জাতীয় তারকার মর্যাদায়।
ফুটবল তখন ছিল দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা।
তারপর কেন হারিয়ে গেল সেই ফুটবল?
বাংলাদেশের ফুটবল হঠাৎ করে হারিয়ে যায়নি।
একদিকে প্রশাসনিক দুর্বলতা, পরিকল্পনার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সংকট ফুটবলকে পিছিয়ে দেয়।
অন্যদিকে ১৯৯৭ সালে ক্রিকেটে বড় সাফল্য এবং ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর পর দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু দ্রুত ক্রিকেটে স্থানান্তরিত হয়।
স্পন্সর, সম্প্রচার, বিনিয়োগ এবং প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ—সবকিছুর বড় অংশ ক্রিকেটমুখী হয়ে পড়ে।
ফুটবল ধীরে ধীরে দর্শক হারাতে থাকে।
বিদেশি দলের প্রতি আবেগ, নিজের ইতিহাসের বিস্মৃতি
আজ বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বকাপে বিদেশি দল নিয়ে যেভাবে আবেগ প্রকাশ করে, তা বিশ্বজুড়েই আলোচনার বিষয়।
কিন্তু সেই আবেগের একটি বড় অংশ নিজের দেশের ফুটবলকে ঘিরে নয়।
এটি শুধু খেলাধুলার পরিবর্তন নয়; বরং সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
যে জাতি একসময় নিজের ফুটবল নিয়ে গর্ব করত, আজ তারা অন্য দেশের সাফল্যে নিজেদের আনন্দ খুঁজে নেয়।
আশার আলো কি ফিরছে?
তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাসও দেখা যাচ্ছে।
নারী ফুটবলে বাংলাদেশের ধারাবাহিক সাফল্য নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছে। পাশাপাশি প্রবাসে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্তির ফলে দর্শকদের আগ্রহও আবার বাড়তে শুরু করেছে।
জাতীয় দলের ম্যাচে দর্শক উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তরুণদের মধ্যেও ফুটবল নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
এসব পরিবর্তন দেখাচ্ছে, সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ থাকলে বাংলাদেশের ফুটবল আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
ইতিহাস থেকে ভবিষ্যতের শিক্ষা
বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাস কেবল কয়েকটি ম্যাচের গল্প নয়। এটি আত্মপরিচয়, সংগ্রাম, সংস্কৃতি এবং জাতীয় চেতনারও ইতিহাস।
একসময় এই মাটিতেই ইংরেজদের হারিয়ে গর্বের ইতিহাস লেখা হয়েছিল। এই দেশ থেকেই এমন খেলোয়াড় উঠে এসেছিলেন, যারা উপমহাদেশের ফুটবলে কিংবদন্তি হয়ে আছেন। স্বাধীনতার সংগ্রামেও ফুটবল ছিল একটি কার্যকর হাতিয়ার।
তাই বাংলাদেশের ফুটবলকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে শুধু নতুন খেলোয়াড় তৈরি করলেই হবে না; ফিরিয়ে আনতে হবে সেই ঐতিহাসিক আত্মবিশ্বাসও। কারণ যে জাতি নিজের গৌরবের ইতিহাস ভুলে যায়, তার ভবিষ্যৎ গড়াও কঠিন হয়ে পড়ে। আর যে জাতি নিজের শিকড়কে স্মরণ করে, তার জন্য নতুন সাফল্যের পথ তৈরি হওয়া অসম্ভব নয়।

