২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর অন্যতম আকর্ষণীয় ম্যাচে আজ মুখোমুখি হচ্ছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবং ইউরোপের চমকপ্রদ দল নরওয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ম্যাচ ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ এখন তুঙ্গে। একদিকে ব্রাজিলের আক্রমণের মূল ভরসা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, অন্যদিকে নরওয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র গোলমেশিন এরলিং হালান্ড। ফলে ব্যক্তিগত লড়াইয়ের পাশাপাশি এটি দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনেরও সংঘর্ষ।
ব্রাজিল কাগজে-কলমে এগিয়ে থাকলেও ইতিহাস বলছে, নরওয়ের বিপক্ষে তারা কখনোই স্বস্তিতে খেলতে পারেনি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে নরওয়ের বিপক্ষে এখনো একটি ম্যাচও জিততে পারেনি সেলেসাওরা। চারবারের দেখায় নরওয়ে জিতেছে দুটি ম্যাচ, আর বাকি দুটি ড্র হয়েছে। তাই অতীতের সেই রেকর্ড ভেঙে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে চাইবে কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা।
গ্রুপ পর্ব ও শেষ বত্রিশ পেরিয়ে দুই দলের যাত্রা
গ্রুপ পর্বে স্কটল্যান্ড ও হাইতিকে হারিয়ে এবং মরক্কোর সঙ্গে ড্র করে গ্রুপের শীর্ষে থেকে নকআউট পর্বে ওঠে ব্রাজিল। তবে শেষ বত্রিশে জাপানের বিপক্ষে তাদের কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়। পিছিয়ে পড়েও যোগ করা সময়ে দুটি গোল করে ২–১ ব্যবধানে নাটকীয় জয় তুলে নেয় ব্রাজিল।
অন্যদিকে নরওয়ে গ্রুপে ইরাক ও সেনেগালকে হারিয়ে এবং ফ্রান্সের কাছে হেরে দ্বিতীয় স্থান নিয়ে শেষ বত্রিশে ওঠে। সেখানে আইভরি কোস্টকে ২–১ গোলে হারিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয়ের স্বাদ পায় স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশটি।
হালান্ডের কাঁধে নরওয়ের স্বপ্ন
এই বিশ্বকাপে নরওয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি নিঃসন্দেহে এরলিং হালান্ড। দলটির করা ১০ গোলের মধ্যে ৫টিই এসেছে তার পা থেকে। মাত্র ২৫ বছর বয়সে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেই দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন এই তারকা ফরোয়ার্ড।
কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে হলে আবারও হালান্ডের গোলের দিকেই তাকিয়ে থাকবে নরওয়ে। তার সঙ্গে মাঝমাঠে মার্টিন ওডেগার্ডের সৃজনশীলতা নরওয়েকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
নরওয়ের প্রধান কোচ স্তালে সোলবাক্কেনও বিশ্বাস করেন, ব্রাজিল ফেভারিট হলেও ম্যাচ জেতা অসম্ভব নয়। তার ভাষায়, ব্রাজিল অবশ্যই শক্তিশালী দল, কিন্তু আমরা শুধু খেলতে নামছি না, জয়ের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামব।
ভিনিসিয়ুসই ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসা
ব্রাজিলের হয়ে এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স করেছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। চার গোল করে তিনি দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই গোল করে তিনি নতুন একটি কীর্তি গড়েছেন। ২০০২ সালের বিশ্বকাপে রোনালদো ও রিভালদোর পর প্রথম ব্রাজিলিয়ান হিসেবে এই কৃতিত্ব দেখিয়েছেন ভিনিসিয়ুস। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০০২ সালেই সর্বশেষ বিশ্বকাপ জিতেছিল ব্রাজিল। ফলে অনেক সমর্থক এটিকে শুভ ইঙ্গিত হিসেবেও দেখছেন।
ইতিহাস যা বলছে
ব্রাজিলের মতো সফল ফুটবল জাতির বিপক্ষে নরওয়ের অপরাজিত রেকর্ড সত্যিই বিরল। চারবারের দেখায় দুটি জয় এবং দুটি ড্র নরওয়ের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশেষ করে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলকে ২–১ গোলে হারানোর স্মৃতি এখনো নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম গর্বের অধ্যায়। সবশেষ ২০০৬ সালে দুই দল একটি প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল, যা ১–১ গোলে ড্র হয়।
আরও একটি পরিসংখ্যান ব্রাজিলকে ভাবিয়ে তুলতে পারে। ২০০২ সালের ফাইনালে জার্মানিকে হারানোর পর থেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ইউরোপের বিপক্ষে টানা ছয়টি ম্যাচে বিদায় নিয়েছে সেলেসাওরা।
পরিসংখ্যান কী বলছে?
পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণে ব্রাজিলকেই এগিয়ে রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য ফলাফলের হিসাব অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে ব্রাজিলের জয়ের সম্ভাবনা ৫৩.৬ শতাংশ। নরওয়ের জয়ের সম্ভাবনা ২২.৪ শতাংশ, আর ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর সম্ভাবনা ২৪ শতাংশ।
তবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পরিসংখ্যান অনেক সময় মাঠের বাস্তবতার কাছে হার মানে। একটি মুহূর্ত, একটি গোল কিংবা একটি ভুলই পুরো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
দুই দলের সম্ভাব্য একাদশ
ব্রাজিল (৪–৩–৩): আলিসন; দানিলো, মারকিনিওস, গ্যাব্রিয়েল, সান্তোস; গিমারায়েস, কাসেমিরো, মার্তিনেল্লি; রায়ান, কুনিয়া, ভিনিসিয়ুস।
নরওয়ে (৪–৩–৩): নিয়ল্যান্ড; পেদারসেন, আয়ের, হেগেম, মোলার উলফে; ওডেগার্ড, বের্গে, বের্গ; সরলথ, হালান্ড, নুসা।
ইনজুরি পরিস্থিতি
ব্রাজিলের মাঝমাঠের খেলোয়াড় লুকাস পাকেতা হ্যামস্ট্রিং চোটে এই ম্যাচে অনিশ্চিত। একই ধরনের চোট কাটিয়ে রাফিনিয়া আলাদাভাবে অনুশীলন শুরু করেছেন এবং বদলি বেঞ্চে থাকতে পারেন।
অন্যদিকে নরওয়ে দলে উরুর চোটের কারণে খেলতে পারবেন না রক্ষণভাগের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় জুলিয়ান রিয়েরসন।
জয়ী দল কার মুখোমুখি হবে?
এই ম্যাচে যে দল জিতবে, তারা আগামী ১১ জুলাই মিয়ামিতে অনুষ্ঠিত কোয়ার্টার ফাইনালে মেক্সিকো ও ইংল্যান্ড ম্যাচের বিজয়ী দলের মুখোমুখি হবে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ভুলের সুযোগ নেই। ব্রাজিল চাইবে ইতিহাসের নেতিবাচক রেকর্ড ভেঙে শিরোপার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে। অন্যদিকে নরওয়ে চাইবে হালান্ডের নেতৃত্বে নতুন ইতিহাস লিখে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছাতে। তাই ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের অন্যতম রোমাঞ্চকর এক লড়াই।

