ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতার নাম নয়, এটি এখন বিশ্বের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক আয়োজনও। এবারের বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন দলের জন্য রাখা হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ পুরস্কার। ট্রফি জয়ের পাশাপাশি শিরোপাজয়ী দল পাবে ৫ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ।
এবার বিশ্বকাপের মোট পুরস্কার তহবিল নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৭ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় এই অর্থ প্রায় দ্বিগুণ। কাতার আসরে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য মোট ৪৪ কোটি ডলার বরাদ্দ ছিল।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা টুর্নামেন্ট পরিচালনার পাশাপাশি সম্প্রচার স্বত্ব, বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বসহ বিভিন্ন উৎস থেকে আয় করে। সেই আয়ের একটি অংশ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে পুরস্কার হিসেবে বিতরণ করা হয়। বাকি অর্থ ফুটবলের উন্নয়ন ও বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যয় করা হয়।
২০২২ সালের বিশ্বকাপ জিতে আর্জেন্টিনা পেয়েছিল ৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। এবার চ্যাম্পিয়ন দল সেই পরিমাণের চেয়ে ৮০ লাখ ডলার বেশি পাবে। আগের বিশ্বকাপগুলোর তুলনায় এবার শিরোপাজয়ী দলের পুরস্কার বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপের আর্থিক পরিধি কতটা বেড়েছে, তার একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
এবারের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী কোনো দলই খালি হাতে ফিরবে না। মোট ৮৭ কোটি ১০ লাখ ডলারের পুরস্কার তহবিলের মধ্যে অবস্থানভিত্তিক পুরস্কার হিসেবে বিতরণ করা হবে ৭০ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অন্যদিকে, বাকি ১৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার অংশগ্রহণকারী সব দলের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হবে। দলের পারফরম্যান্স কেমন হয়েছে, তার ওপর এই অর্থ নির্ভর করবে না।
ফলে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রতিটি দল ন্যূনতম ১ কোটি ২৫ লাখ ডলার নিশ্চিতভাবে পাবে। এর মধ্যে ১ কোটি ডলার অংশগ্রহণ ফি এবং ২৫ লাখ ডলার প্রস্তুতি ব্যয় হিসেবে দেওয়া হবে।
ফিফার আয় কত?
বিশ্বকাপ থেকে পুরস্কার হিসেবে দেওয়া অর্থের পরিমাণ বড় হলেও ফিফার মোট আয়ের তুলনায় তা একটি ছোট অংশ। এবারের টুর্নামেন্ট ঘিরে ফিফার সম্ভাব্য আয় প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ৮৭ কোটি ১০ লাখ ডলার পুরস্কার হিসেবে ব্যয় করা হচ্ছে, যা মোট আয়ের প্রায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
ফিফা নিজেদের একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরে। সংস্থাটির দাবি, তারা প্রায় ১ হাজার ১৭০ কোটি ডলার ফুটবলের উন্নয়ন ও পুনর্বিনিয়োগে ব্যবহার করবে।
কোথা থেকে আসছে ফিফার আয়?
ফিফার আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস সম্প্রচার স্বত্ব। এবারের আয় থেকে প্রায় ৪২৬ কোটি ডলার আসছে টেলিভিশন ও সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি থেকে। এ ছাড়া টিকিট বিক্রি থেকে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার এবং পৃষ্ঠপোষকতা ও লাইসেন্সিং কার্যক্রম থেকে প্রায় ৩২০ কোটি ডলার আয়ের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এর বাইরে আরও কিছু বাণিজ্যিক উৎস রয়েছে।
এবার বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ফিফার আয় বাড়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। বেশি ম্যাচ মানে সম্প্রচার, বিজ্ঞাপন ও টিকিট বিক্রির পরিমাণও বাড়ছে।
ফিফা এবার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকেও আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। মিডিয়া সহযোগীদের মাধ্যমে টিকটক ও ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিট সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ডিজিটাল দর্শক বাড়ানোর পাশাপাশি এসব প্ল্যাটফর্ম থেকে নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছে ফিফা।
এবারের বিশ্বকাপে টিকিট বিক্রিতেও নতুন কৌশল নিয়েছে ফিফা। সংস্থাটি ডায়নামিক প্রাইসিং পদ্ধতি চালু করেছে। অর্থাৎ চাহিদা যত বেশি, টিকিটের দামও তত বাড়বে। বিশেষ করে ফাইনালের টিকিটের দাম সবচেয়ে বেশি। একপর্যায়ে এর দাম প্রায় ১১ হাজার মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রাথমিক টিকিট মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৬০০ ডলার। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে ফাইনালের টিকিটের দাম প্রায় সাত গুণ বেড়েছে।
বিশ্বকাপ ও অন্যান্য বড় আয়োজন থেকে ফিফার আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের আয়ও বেড়েছে। ২০২৫ সালে ফিফা সভাপতি প্রায় ৬১ লাখ ডলার আয় করেছেন। এর মধ্যে ক্লাব বিশ্বকাপ থেকে পাওয়া বোনাস ছিল ২৮ লাখ ডলার।
সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াইয়ের কারণে নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও ফিফার অন্যতম বড় আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রেকর্ড পুরস্কার, সম্প্রচার আয় বৃদ্ধি, নতুন বাণিজ্যিক কৌশল এবং আধুনিক টিকিট ব্যবস্থাপনা—সবকিছু মিলিয়ে ফুটবল এখন কত বড় বৈশ্বিক অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠেছে, এবারের আয়োজন তারই উদাহরণ।

