ম্যানচেস্টার সিটির জন্য এবারের গ্রীষ্মকালীন দলবদল ছিল বড় ধরনের পুনর্গঠনের। একের পর এক অভিজ্ঞ ও গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে হারিয়ে নতুন করে দল সাজাতে গিয়ে বিপুল অর্থ খরচ করেছে ইংলিশ ক্লাবটি। শেষ দিনে এনজো ফার্নান্দেজ ও ইলিমান এনদিয়েকে দলে টেনে গ্রীষ্মকালীন দলবদলে সিটির মোট খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫৫.৮ মিলিয়ন পাউন্ড।
অন্যদিকে খেলোয়াড় বিক্রি ও স্থায়ীভাবে ছেড়ে দিয়ে সিটি আয় করেছে প্রায় ৩০৭.২ মিলিয়ন পাউন্ড। অর্থাৎ আয়-ব্যয়ের হিসাব মিলিয়ে গ্রীষ্মে ক্লাবটির নিট খরচ প্রায় ১৪৮.৬ মিলিয়ন পাউন্ড।
সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ হয়েছে এনজো ফার্নান্দেজকে আনতে। চেলসি থেকে আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডারকে পেতে সিটি খরচ করেছে ১২ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড। এটি ব্রিটিশ দলবদলের ইতিহাসের যৌথ সর্বোচ্চ মূল্য।
এনজো-অ্যান্ডারসনেই ২৪ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড
সিটির সবচেয়ে বড় দুটি বিনিয়োগই এসেছে মাঝমাঠে। নটিংহাম ফরেস্ট থেকে এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে আনতে খরচ হয়েছে ১১ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড। এরপর চেলসি থেকে এনজো ফার্নান্দেজের জন্য আরও ১২ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড খরচ করেছে তারা।
এর সঙ্গে লিলের তরুণ মিডফিল্ডার আয়ুব বুয়াদ্দির জন্য ব্যয় হয়েছে ৮ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড। ১৮ বছর বয়সী এই খেলোয়াড় ইংলিশ ফুটবলে সবচেয়ে দামি কিশোর খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে সিটির দলে যোগ দিয়েছেন।
সিটির এবারের গ্রীষ্মকালীন কেনাকাটার তালিকা—
- এনজো ফার্নান্দেজ — চেলসি থেকে, ১২ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড
- এলিয়ট অ্যান্ডারসন — নটিংহাম ফরেস্ট থেকে, ১১ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড
- আয়ুব বুয়াদ্দি — লিল থেকে, ৮ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড
- ইলিমান এনদিয়ায়ে — এভারটন থেকে, ৬ কোটি পাউন্ড
- অ্যালান এলিয়াস — পালমেইরাস থেকে, ৩ কোটি ৪৪ লাখ পাউন্ড
- ম্যাথিস দেতুরবে — ত্রোয়া থেকে, ২ কোটি ১৪ লাখ পাউন্ড
- জেরেমি মঙ্গা — লেস্টার সিটি থেকে, ১ কোটি পাউন্ড
- পিয়ের্স চার্লস — শেফিল্ড ওয়েডনেসডে থেকে, ৩০ লাখ পাউন্ড
- জেরোনিমো রুলি — মার্সেই থেকে, মূল্য প্রকাশ করা হয়নি।
অর্থাৎ শুধু নতুন খেলোয়াড় কেনার ক্ষেত্রেই সিটির ব্যয় প্রায় ৪৫ কোটি ৫৮ লাখ পাউন্ড।
বিক্রিতেও বড় অঙ্কের আয়
শুধু অর্থ খরচ করেই থেমে থাকেনি সিটি। দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে বিক্রি করে বড় অঙ্কের অর্থও তুলে নিয়েছে ক্লাবটি।
সবচেয়ে বেশি অর্থ এসেছে ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার সাভিনিওকে টটেনহ্যাম হটস্পারের কাছে বিক্রি করে। তাঁর জন্য সিটি পেয়েছে ৭ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড।
এরপর স্পেনের তারকা মিডফিল্ডার রদ্রিকে বার্সেলোনার কাছে বিক্রি করে ৬ কোটি ৫৪ লাখ পাউন্ড পেয়েছে তারা। তিজানি রেইন্ডার্স আল-কাদসিয়াহতে গেছেন ৫ কোটি ২০ লাখ পাউন্ডে, আর নিকো গঞ্জালেস নিউক্যাসল ইউনাইটেডে গেছেন ৫ কোটি পাউন্ডে।
সিটির উল্লেখযোগ্য স্থায়ী বিক্রিগুলো হলো—
- সাভিনিও — টটেনহ্যাম, ৭ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড
- রদ্রি — বার্সেলোনা, ৬ কোটি ৫৪ লাখ পাউন্ড
- তিজানি রেইন্ডার্স — আল-কাদসিয়াহ, ৫ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড
- নিকো গঞ্জালেস — নিউক্যাসল ইউনাইটেড, ৫ কোটি পাউন্ড
- জেমস ট্রাফোর্ড — লিডস ইউনাইটেড, ৪ কোটি পাউন্ড
- ম্যানুয়েল আকাঞ্জি — ইন্টার মিলান, ১ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ড
- নাথান আকে — ফেনেরবাহচে, ৭০ লাখ পাউন্ড
- জাহমাই সিম্পসন-পুসি — এফসি কোলন, ৪৭ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড
- রেইগান হেস্কি — কোলন, ৮০ লাখ পাউন্ড
- ইসা কাবোরে — রেক্সহ্যাম, ২০ লাখ পাউন্ড।
বিনা মূল্যে ছাড়লেন দুই দীর্ঘদিনের তারকা
সিটির এবারের পরিবর্তনের সবচেয়ে প্রতীকী দিক সম্ভবত বিনা মূল্যে দুই দীর্ঘদিনের খেলোয়াড়ের বিদায়।
বার্নার্দো সিলভা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিনা মূল্যে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়েছেন। আর জন স্টোনসকে চুক্তির মেয়াদ শেষে ছেড়ে দিয়েছে সিটি। দুজনই দীর্ঘ সময় ধরে ক্লাবটির সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।
ধারে গেলেন আরও অনেকে
স্থায়ী বিক্রির বাইরে বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়কে ধারে পাঠিয়েছে সিটি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—
ওমর মারমুশ—টটেনহ্যাম, কালভিন ফিলিপস—শেফিল্ড ইউনাইটেড, জ্যাক গ্রিলিশ—এভারটন, স্ভেরে নিপান—লোমেল, দিভিন মুবামা—সাউদাম্পটন, ম্যাক্স অ্যালেইন—বার্নলি, ক্রিশ্চিয়ান ম্যাকফারলেন—লেস্টার সিটি, জুমা বাহ—আউগসবুর্গ, ডিভাইন মুকাসা—ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেড এবং জেরেমি দেতুরবে—মোনাকো।
কেন এত বড় পরিবর্তন?
সিটির এই বিপুল ব্যয়ের পেছনে শুধু নতুন খেলোয়াড় কেনার ইচ্ছা নয়, বরং দলের কাঠামোগত পরিবর্তনও বড় কারণ। দীর্ঘদিনের কোচ পেপ গার্দিওলার অধ্যায় শেষ হওয়ার পর নতুন কোচ এনজো মারেস্কার অধীনে দলটি নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। একই সময়ে রদ্রি, বার্নার্দো সিলভা, তিজানি রেইন্ডার্স, সাভিনিওসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় দল ছেড়েছেন।
ফলে সিটির এবারের দলবদলকে শুধু ‘বেশি টাকা খরচের’ বাজার বলা কঠিন। পুরোনো কাঠামোর বড় অংশ সরিয়ে নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের নিয়ে দল সাজানোর চেষ্টা করেছে ক্লাবটি।
তবে এত বড় বিনিয়োগের পর প্রত্যাশাও বেড়েছে। বিশেষ করে এনজো ফার্নান্দেজের মতো ১২ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ডের খেলোয়াড়কে ঘিরে এখন সিটির সমর্থকদের প্রত্যাশা—এই বিপুল ব্যয় মাঠে কতটা সাফল্যে রূপ নেয়, সেটিই হবে নতুন মৌসুমের বড় প্রশ্ন।

