ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে আর মাত্র একটি ম্যাচ। বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল স্পেন। একদিকে লিওনেল মেসির অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে লামিনে ইয়ামালদের তারুণ্য—দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের এই লড়াইয়ের আগে পরিসংখ্যানও দারুণ রোমাঞ্চের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পুরো আসরে বল দখল ও পাসিং ফুটবলে স্পেন ছিল অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে। দলের মাঝমাঠের ভরসা রদ্রি ইতোমধ্যে ৬৪৮টি সফল পাস সম্পন্ন করেছেন, যা বিশ্বকাপের এক আসরে নতুন রেকর্ড। এর আগে কাতার বিশ্বকাপে তিনিই করেছিলেন ৬৩৮টি সফল পাস। এই তালিকায় তার সতীর্থ পাও কুবারসি ৫৪৭টি এবং এমেরিক লাপোর্তে ৫৩৩টি সফল পাস দিয়ে পরের দুটি অবস্থানে রয়েছেন। এর আগে স্পেনের আরেক কিংবদন্তি জাভি ২০১০ বিশ্বকাপে ৫৯৯টি সফল পাস করেছিলেন।
শুধু বলের নিয়ন্ত্রণ নয়, ধারাবাহিক ফলেও দুর্দান্ত স্পেন। দলটি টানা ৩৭টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অপরাজিত, যা পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলের যৌথ সর্বোচ্চ রেকর্ড। ২০২৪ সালের মার্চে কলম্বিয়ার বিপক্ষে হারের পর থেকে স্পেন ২৭টি ম্যাচ জিতেছে এবং ১০টি ম্যাচ ড্র করেছে। এর আগে ইতালি ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত ছিল।
ড্রিবলিংয়েও স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল সবার ওপরে। এবারের বিশ্বকাপে তিনি ৩০টি সফল ড্রিবল সম্পন্ন করেছেন। তার পেছনে রয়েছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে (২৪), ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (২৩), আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি (২২) এবং বেলজিয়ামের জেরেমি ডোকু (২১)। তবে এক আসরে সর্বাধিক সফল ড্রিবলের রেকর্ড এখনও দিয়েগো ম্যারাডোনার দখলে। তিনি ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ৫৩টি সফল ড্রিবল করেছিলেন। এই শতাব্দীতে এক আসরে সর্বোচ্চ ৪৬টি সফল ড্রিবলের রেকর্ড মেসির, যা তিনি ২০১৪ বিশ্বকাপে গড়েছিলেন।
গোল করার দিক থেকে এবারের আসরে আর্জেন্টিনা ছিল সবচেয়ে বিধ্বংসী দল। সাত ম্যাচে তারা করেছে ১৯টি গোল, অর্থাৎ ম্যাচপ্রতি গড় ২.৭১টি গোল। ১৯৭০ সালের ব্রাজিলের পর কোনো দল এক বিশ্বকাপে এত গোল করতে পারেনি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে মাত্র চারটি দল এক আসরে এর চেয়ে বেশি গোল করার কৃতিত্ব দেখিয়েছে।
অন্যদিকে স্পেনও নিজেদের আক্রমণভাগে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এবারের বিশ্বকাপে তারা করেছে ১৩টি গোল, যা তাদের আগের সেরা পারফরম্যান্সের চেয়ে দুই গোল বেশি। এমনকি ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের আসরের তুলনায়ও এবার তারা পাঁচটি বেশি গোল করেছে।
আর্জেন্টিনা টানা ১৩টি বিশ্বকাপ ম্যাচে অন্তত দুটি করে গোল করেছে, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন রেকর্ড। সর্বশেষ ২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে হারের ম্যাচেই শেষবার তারা দুই গোলের কম করেছিল।
এবারের বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির গোলসংখ্যা ৮টি। বিশ্বকাপের এক আসরে এর চেয়ে বেশি গোল করেছেন মাত্র পাঁচজন ফুটবলার। পাশাপাশি ৮ গোল ও ৪টি গোলে সহায়তা মিলিয়ে তার মোট ১২টি গোলে অবদান, যা বিশ্বকাপে দীর্ঘ সময়ের মধ্যে অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স।
দল হিসেবেও দুর্দান্ত আর্জেন্টিনা। এবারের আসরে তারা টানা সাতটি ম্যাচেই জয় পেয়েছে। ফাইনাল জিততে পারলে ব্রাজিলের ২০০২ সালের রেকর্ড স্পর্শ করার পাশাপাশি শতভাগ জয়ের রেকর্ড নিয়ে বিশ্বকাপ জেতা ইতিহাসের মাত্র পঞ্চম দল হবে তারা।
রক্ষণভাগে অবশ্য স্পেনের আধিপত্য আরও স্পষ্ট। গোলরক্ষক উনাই সিমন সাত ম্যাচে ছয়টি ম্যাচে জাল অক্ষত রেখেছেন, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে এক আসরে সর্বাধিক ক্লিন শিটের নতুন রেকর্ড। এর আগে কোনো গোলরক্ষক পাঁচটির বেশি ক্লিন শিট রাখতে পারেননি।
স্পেন পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করেছে। ফাইনালেও যদি তারা সফল হয়, তাহলে বিশ্বকাপজয়ী দল হিসেবে সবচেয়ে কম গোল হজম করার নতুন ইতিহাস গড়বে। এর আগে ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স, ২০০৬ সালে ইতালি এবং ২০১০ সালে স্পেন—প্রতিটি দল শিরোপা জয়ের পথে দুটি করে গোল হজম করেছিল। বিপরীতে আর্জেন্টিনা এবারের আসরে সাতটি গোল হজম করেছে।
দূরপাল্লার শট থেকেও আর্জেন্টিনা ছিল দারুণ কার্যকর। তারা পেনাল্টি এলাকার বাইরে থেকে পাঁচটি গোল করেছে, যা এবারের বিশ্বকাপে যৌথভাবে সর্বোচ্চ।
স্পেনের হয়ে সবচেয়ে সফল গোলদাতা মিকেল ওইয়ারসাবাল। তিনি এবারের বিশ্বকাপে ৫টি গোল করেছেন, যা স্পেনের এক বিশ্বকাপ আসরে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেছে। এর আগে ১৯৮৬ সালে এমিলিও বুত্রাগেনিও এবং ২০১০ সালে দাভিদ ভিয়া একই সংখ্যক গোল করেছিলেন। গোল ও গোলে সহায়তা মিলিয়ে ওইয়ারসাবালের মোট অবদান ৬টি, যা স্পেনের ইতিহাসেও যৌথ সর্বোচ্চ।
গোল করানোর ক্ষেত্রেও আলোচনায় আছেন লিওনেল মেসি। এবারের আসরে তিনি ৪টি গোলে সহায়তা করেছেন এবং সর্বোচ্চ সহায়তাকারীর তালিকায় শীর্ষে থাকা ফ্রান্সের মাইকেল অলিজের চেয়ে মাত্র একটি সহায়তা পিছিয়ে রয়েছেন। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের ছয়টি ভিন্ন আসরে অন্তত একটি করে গোলে সহায়তা করার নিজের অনন্য রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করেছেন। স্পেনের হয়ে সর্বোচ্চ দুটি করে গোলে সহায়তা করেছেন মার্ক কুকুরেয়া ও দানি ওলমো।
ফাইনালের আগে পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, আক্রমণে আর্জেন্টিনা এবং রক্ষণে স্পেন—দুই দলই নিজেদের স্বতন্ত্র শক্তি নিয়ে মাঠে নামছে। ফলে শিরোপা নির্ধারণী এই ম্যাচ শুধু দুই দলের নয়, দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনেরও এক আকর্ষণীয় লড়াই হতে যাচ্ছে।

