পাঁচ সপ্তাহের ফুটবল উৎসব শেষ হয়েছে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ মেতে উঠেছিল ফুটবলের মহাযজ্ঞে। ৪৮ দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই আসরে ছিল বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্র থেকে শুরু করে ছোট ছোট দ্বীপদেশের প্রতিনিধিত্ব। ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও বাস্তবতার মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছিল ফুটবল।
মেসি, ইয়ামাল, এমবাপ্পেদের নৈপুণ্য ঘিরে তৈরি হয়েছিল উন্মাদনা। কিন্তু বিশ্বকাপ শুধু একটি ট্রফি জয়ের লড়াই নয়, এটি মানুষের আবেগ, ভালোবাসা ও ঐক্যের এক অনন্য প্রকাশ। তাই তো ফুটবল বিশ্বকাপকে বলা হয় ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’।
এই মহাযজ্ঞে বাংলাদেশ ছিল দর্শকের ভূমিকায়। তবে ফুটবলের প্রতি এ দেশের মানুষের ভালোবাসা কোনো অংশে কম ছিল না। বরং বিশ্বকাপ ঘিরে বাংলাদেশের মানুষের উন্মাদনা আবারও প্রমাণ করেছে, ফুটবল এ দেশের মানুষের হৃদয়ের খুব কাছের একটি খেলা।
পতাকা, জার্সি আর ফুটবল উৎসবে বাংলাদেশ:
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর থেকেই বদলে গিয়েছিল দেশের চেনা দৃশ্যপট। রাজধানীর অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জ, শহর থেকে বস্তি—সবখানেই দেখা গেছে বিভিন্ন দেশের পতাকার সমারোহ।
প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে অনেকেই বাড়ি সাজিয়েছেন প্রিয় দেশের পতাকার রঙে। কেউ পরেছেন পছন্দের দলের জার্সি, কেউ আবার আয়োজন করেছেন বড় পর্দায় খেলা দেখার। হোটেল-রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান, অফিস কিংবা পাড়ার আড্ডায় ফুটবলই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। খেলার কৌশল, খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স কিংবা কোচের সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছে তর্ক-বিতর্ক। কয়েক সপ্তাহের জন্য হলেও মানুষ যেন নিজেদের দৈনন্দিন দুশ্চিন্তা ভুলে ডুবে ছিল ফুটবলের আনন্দে।
বাংলাদেশের দর্শকদের এই ভালোবাসা নজর কেড়েছে আন্তর্জাতিক মহলেও। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকদের উন্মাদনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে কিন্তু এই উচ্ছ্বাসের মাঝেই সামনে এসেছে একটি বড় প্রশ্ন—যে দেশে ফুটবল নিয়ে এত আবেগ, সেই দেশ কেন এখনো বিশ্ব ফুটবলের মূল মঞ্চে জায়গা করে নিতে পারছে না?
দর্শক থেকে অংশগ্রহণকারী হওয়ার স্বপ্ন:
বিশ্বকাপ চলাকালে অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে—বাংলাদেশ কি শুধু অন্য দেশের সাফল্যে আনন্দিত হবে, নাকি একদিন নিজের পতাকা নিয়েও বিশ্বকাপের মাঠে নামবে? কেপ ভার্দের মতো ছোট একটি দেশ যদি বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের পক্ষেও সেই স্বপ্ন দেখা অসম্ভব নয়।
এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক অবকাঠামো এবং তরুণ প্রতিভা তৈরির উদ্যোগ। বাংলাদেশের ফুটবলে সাম্প্রতিক সময়ে এমন কিছু উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে, যা নতুন আশার সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়নে বেসরকারি খাতের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে বসুন্ধরা গ্রুপের উদ্যোগে ফুটবল অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি সামনে এসেছে। বসুন্ধরা কিংসের জন্য নির্মিত আধুনিক অ্যারেনা, অনুশীলন মাঠ এবং উন্নত সুযোগ-সুবিধা দেশের ক্লাব ফুটবলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনা ফিফা ও এএফসির স্বীকৃতিও পেয়েছে।
২০২২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনার উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান জানিয়েছিলেন, ক্লাবের লক্ষ্য একটি বড় আবাসিক একাডেমি তৈরি করা, যেখানে বিপুল সংখ্যক তরুণ ফুটবলার প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবে। এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতের খেলোয়াড় তৈরি করা। কারণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য পেতে হলে বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকেই প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করতে হয়।
বয়সভিত্তিক ফুটবলে নতুন আশা:
বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক ফুটবলে সাম্প্রতিক কিছু সাফল্য ফুটবলপ্রেমীদের নতুন করে আশাবাদী করেছে। সাফ অনূর্ধ্ব-২০ পুরুষ ফুটবলে ভারতকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশের দল। অন্যদিকে নারী ফুটবলেও এসেছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের মেয়েরা। যদিও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা কঠিন, তবে তরুণ খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো বসুন্ধরা কিংসের অনূর্ধ্ব-১৬ দলের আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সুযোগ। চীনে অনুষ্ঠিতব্য হুরাই কাপে খেলার আমন্ত্রণ পেয়েছে বসুন্ধরা কিংস। চলতি বছরের অক্টোবরে চীনের জাংজুতে অনুষ্ঠিত হবে এই আসর।
এই টুর্নামেন্টে অংশ নেবে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কয়েকটি নামী ক্লাবের বয়সভিত্তিক দল। এর মধ্যে রয়েছে জার্মানির বুরুশিয়া ডর্টমুন্ড, নেদারল্যান্ডসের পিএসভি ও ফেনর্ড, পর্তুগালের স্পোর্টিং সিপি, ব্রাজিলের সাও পাওলো এবং আর্জেন্টিনার রিভার প্লেট। স্বাগতিক চীনের বাইরে এশিয়ার একমাত্র দল হিসেবে বসুন্ধরা কিংস এই আসরে অংশ নিচ্ছে।
এ ধরনের প্রতিযোগিতা তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য বড় অভিজ্ঞতার সুযোগ। বিশ্বের শীর্ষ ক্লাবগুলোর বয়সভিত্তিক দলের বিপক্ষে খেলার মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক ফুটবলের মান ও কৌশল সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ পাবে।
বিশ্বকাপের স্বপ্ন কি একদিন সত্যি হবে?
বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের আবেগ প্রমাণ করে, এই দেশে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার অভাব নেই। অভাব ছিল পরিকল্পনা, অবকাঠামো ও ধারাবাহিক উদ্যোগের।
বিশ্ব ফুটবলের বড় দলগুলোর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একাডেমি ব্যবস্থা ও তৃণমূল পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়া। বাংলাদেশেও যদি সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায়, তাহলে একদিন বিশ্বকাপের মঞ্চে লাল-সবুজ পতাকা দেখার স্বপ্ন বাস্তব হতে পারে। কারণ ফুটবলে বড় সাফল্য একদিনে আসে না। প্রয়োজন ধৈর্য, পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগ।
আজ যারা বিশ্বকাপ দেখছে, তাদের মধ্য থেকেই হয়তো আগামী দিনের বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলোয়াড় তৈরি হবে। প্রশ্ন শুধু একটাই—আমরা কি সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মতো প্রস্তুতি নিতে পারছি?

