প্রায় দুই যুগ পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সফর করছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এই সফরকে ঘিরে সমর্থকদের প্রত্যাশাও ছিল বেশ বড়। কিন্তু মূল সিরিজ শুরুর আগেই প্রস্তুতি ম্যাচে যে চিত্র দেখা গেল, তা বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ডারউইনে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে ইনিংস ও ৩৮ রানে হেরেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। সবচেয়ে হতাশার বিষয়, দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৫৪ রানে গুটিয়ে গেছে বাংলাদেশের ব্যাটিং। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলের নিয়মিত একাদশের বিপক্ষে নয়, অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের নিয়ে গড়া অস্ট্রেলিয়া একাদশের কাছেই এমন পরাজয় এসেছে।
ম্যাচটি শেষ হয়েছে মাত্র সোয়া দুই দিনে। আর এই পরাজয় শুধু একটি প্রস্তুতি ম্যাচের ফল হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। বাংলাদেশের ব্যাটিং, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দলীয় লড়াইয়ের সামর্থ্য—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে এই ম্যাচ।
প্রথম ইনিংসে মিরাজের ব্যাটে কিছুটা স্বস্তি
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য বাংলাদেশের জন্য এতটা খারাপ ছিল না। প্রথম ইনিংসে মেহেদী হাসান মিরাজের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে বাংলাদেশ ২৬৩ রান সংগ্রহ করে। দলের অন্য ব্যাটাররা বড় ইনিংস খেলতে না পারলেও মিরাজের ব্যাটে ভর করে অন্তত একটি লড়াই করার মতো সংগ্রহ দাঁড় করাতে পেরেছিল বাংলাদেশ।
এরপর অস্ট্রেলিয়া একাদশ ব্যাটিংয়ে নামলে বাংলাদেশের বোলারদের সামনে সুযোগ ছিল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার। প্রতিপক্ষের দলে অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকায় সেটিই ছিল স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ।
স্পিনারদের জন্য কিছুটা সহায়ক হয়ে ওঠা উইকেটেও বাংলাদেশের বোলাররা দীর্ঘ সময় ধরে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে চাপ তৈরি করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ৩৫৫ রানে থামে অস্ট্রেলিয়া একাদশের ইনিংস। ফলে প্রথম ইনিংসেই বাংলাদেশ ৯২ রানে পিছিয়ে পড়ে।
তখনও ম্যাচটি বাংলাদেশের হাতের বাইরে চলে যায়নি। দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো ব্যাটিং করে ঘাটতি পূরণ করে লড়াইয়ে ফেরার সুযোগ ছিল।
কিন্তু সেটিই আর হলো না।
দ্বিতীয় ইনিংসে ভয়াবহ ব্যাটিং ধস
প্রথম ইনিংসের তুলনায় দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটিং যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চেহারা দেখিয়েছে। দ্বিতীয় দিন শেষে মাত্র ১৯ রানে ২ উইকেট হারিয়েছিল বাংলাদেশ। তখনও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না।
তৃতীয় দিনের শুরুতেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
অস্ট্রেলিয়া একাদশের বোলার ক্যাম্পবেল থমসন বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপের জন্য বড় দুঃস্বপ্ন হয়ে ওঠেন। আগের দিন বিকেলে ২ উইকেট নেওয়ার পর তৃতীয় দিনেও তিনি বাংলাদেশের ব্যাটারদের একের পর এক ফিরিয়ে দেন।
শেষ পর্যন্ত ১১ ওভারে ৮ উইকেট নিয়ে ইনিংস শেষ করেন থমসন। অর্থাৎ বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসের ১০ উইকেটের ৮টিই গেছে তার শিকার হয়ে। তার বোলিংয়ের স্ট্রাইক রেট ছিল মাত্র ৮.২৫—যা এই ম্যাচে বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়ের গভীরতাই তুলে ধরে।
কোরি রোকিচ্চিওলি নেন বাকি দুটি উইকেট।
সর্বোচ্চ রান মাত্র ২২!
বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসের স্কোরকার্ডই সবচেয়ে বেশি হতাশার কারণ। পুরো দল মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়েছে। দলের হয়ে সর্বোচ্চ রান এসেছে তানজিদ হাসান তামিমের ব্যাট থেকে—মাত্র ২২।
অর্থাৎ দলের একজন ব্যাটারও ২৫ রানের ঘর পেরোতে পারেননি।
তানজিদের পর বাংলাদেশের ব্যাটারদের রান ছিল যথাক্রমে ৬, ৬, ৫, ২, ৪, ০, ৬, ২, ০ ও ০।
এমন স্কোর কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের একটি পূর্ণাঙ্গ দলের জন্য স্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার মতো কন্ডিশনে আসন্ন সিরিজের প্রস্তুতি হিসেবে এই ম্যাচটি যখন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তখন এমন ব্যাটিং বিপর্যয় দলের প্রস্তুতি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলবে।
শুধু একটি ম্যাচের ব্যর্থতা নয়
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো, সাম্প্রতিক সময়ের পারফরম্যান্সের সঙ্গে এই ম্যাচের ফলকে আলাদা করে দেখা কঠিন।
কিছুদিন আগেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ইনিংস ও ৮৫ রানে হেরেছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচেও দুই ইনিংসে দলের সংগ্রহ ২০০ রানের নিচে ছিল।
এরপর অস্ট্রেলিয়া সফরের শুরুতেই অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে ইনিংস ব্যবধানে হার।
অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল প্রতিপক্ষের শক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বিষয় নয়। ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিকতা, উইকেট ধরে রাখার সক্ষমতা এবং চাপের মুখে দলের সামগ্রিক পরিকল্পনা—সবকিছু নিয়েই নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার মূল দলের বিপক্ষে কী অপেক্ষা করছে?
প্রস্তুতি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে বাংলাদেশের এমন ফল মূল সিরিজের আগে স্বস্তির কোনো বার্তা দিচ্ছে না।
এরই মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার তারকা ব্যাটার ট্র্যাভিস হেড বলেছিলেন, আগামী সপ্তাহে বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়াকে খুব ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার মূল দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারের এমন মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, তারা বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
কিন্তু বাংলাদেশের প্রস্তুতি ম্যাচের ফল সেই আত্মবিশ্বাসকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
অবশ্য প্রস্তুতি ম্যাচ এবং আন্তর্জাতিক সিরিজ এক নয়। প্রস্তুতি ম্যাচে দল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারে, খেলোয়াড়দের ভূমিকা পরিবর্তন হতে পারে এবং কৌশলগতভাবে কিছু বিষয় গোপন রাখারও চেষ্টা থাকতে পারে। তাই এই একটি ম্যাচের ফল দিয়ে পুরো সিরিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা ঠিক হবে না।
তবে ৫৪ রানে অলআউট হওয়া এবং ইনিংস ব্যবধানে পরাজয়কে উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।
ব্যাটিং নিয়েই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে বাংলাদেশের ব্যাটারদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে নতুন বল সামলানো, অফ স্টাম্পের বাইরের বল ছেড়ে দেওয়া এবং দীর্ঘ সময় উইকেটে থাকার মানসিকতা দেখানো।
প্রস্তুতি ম্যাচে সেই জায়গাতেই বড় ঘাটতি দেখা গেছে।
বিশেষ করে দ্বিতীয় ইনিংসে দ্রুত উইকেট হারানোর পর দলের কোনো ব্যাটারই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি। একজন ব্যাটারও যদি দীর্ঘ সময় উইকেটে থেকে প্রতিরোধ গড়তে পারতেন, তাহলে ম্যাচের চেহারা হয়তো অন্যরকম হতে পারত।
এখন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো এই ব্যর্থতা থেকে দ্রুত শিক্ষা নেওয়া। মূল সিরিজে একই ধরনের ব্যাটিং ধস হলে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো আরও কঠিন হবে।
সফরের শুরুতেই সতর্কবার্তা
প্রায় দুই যুগ পর অস্ট্রেলিয়া সফর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য বড় সুযোগ। এমন সফর থেকে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য আত্মবিশ্বাস অর্জন করারও সুযোগ থাকে।
কিন্তু সেই সফরের শুরুতেই ৫৪ রানে অলআউট হয়ে ইনিংস ব্যবধানে হার বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় সতর্কবার্তা।
এখন সামনে মূল সিরিজ। প্রস্তুতি ম্যাচের ব্যর্থতা থেকে বাংলাদেশ কতটা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কারণ প্রস্তুতি ম্যাচে হার ভুলে যাওয়া যায়, কিন্তু একই ধরনের ব্যাটিং বিপর্যয় যদি আন্তর্জাতিক ম্যাচেও ফিরে আসে, তাহলে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি অনেক কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

