ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিনটা যেন ছিল দুই দলের বোলারদের দাপটের দিন। পুরো দিনে দুই দলের ব্যাটারদের উইকেটে আসা-যাওয়া হয়েছে ১৮ বার। শুরুতে মিচেল স্টার্কের বিধ্বংসী বোলিংয়ে মাত্র ৬৪ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশের ইনিংস। কিন্তু দিনের শেষভাগে শরিফুল ইসলামের দুর্দান্ত প্রতিরোধে ম্যাচে ফেরে বাংলাদেশও।
প্রথম দিন শেষে অস্ট্রেলিয়া ১০১ রানে এগিয়ে। বাংলাদেশের ৬৪ রানের জবাবে ১৬৫ রান তুলেছে তারা, তবে এর মধ্যেই হারিয়েছে ৮ উইকেট। বাংলাদেশের হয়ে বল হাতে একাই ঝড় তুলেছেন শরিফুল। ৩৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং করেছেন বাঁহাতি এই পেসার।
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ভরসা ক্যামেরন গ্রিন। দিনের শেষ পর্যন্ত ৫১ রানে অপরাজিত তিনি। তার সঙ্গে ১০ রানে অপরাজিত আছেন ন্যাথান লায়ন। দুজনের ১৭ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে দিন শেষ করেছে স্বাগতিকেরা।
সকালে টস জিতে বোলিং নেওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামান মিচেল স্টার্ক। ইনিংসের প্রথম বলেই উইকেট তুলে নিয়ে শুরু করেন তাণ্ডব। এরপর মাত্র ২২ বলের মধ্যে ৫ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে কার্যত ম্যাচ থেকেই ছিটকে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করেন তিনি।
মাত্র ১২ রানেই ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। এরপর আর ঘুরে দাঁড়ানোর মতো বড় জুটি গড়ে ওঠেনি। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৬৪ রানে শেষ হয় বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস।
বাংলাদেশের হয়ে মেহেদী হাসান মিরাজ, হাসান মাহমুদ, তাইজুল ইসলাম ও শরিফুল ইসলাম দুই অঙ্কের রান করেন। তবে দলের সর্বোচ্চ রান আসে শেষ ব্যাটার হিসেবে ব্যাট করতে নামা শরিফুলের কাছ থেকেই—১৪ রান।
স্টার্কের আগুনঝরা বোলিংয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং যখন একেবারে ভেঙে পড়েছে, তখনও দিনের দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশকে লড়াইয়ে রাখার মতো কিছু একটা করার সুযোগ ছিল বোলারদের সামনে।সেই সুযোগটিই কাজে লাগান শরিফুল।
দ্বিতীয় সেশনে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়াও স্বস্তিতে থাকতে পারেনি। ২২ রানে প্রথম উইকেট হারায় তারা। তাসকিন আহমেদের বলে সাজঘরে ফেরেন ম্যাট রেনশো।এরপর শুরু হয় শরিফুলের দুর্দান্ত স্পেল।
প্রথমে ট্রেভিস হেডকে ফিরিয়ে দেন তিনি। এরপর একই ওভারে মারনাশ লাবুশানেকেও আউট করে দেন। ৪১ রানেই ৩ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে অস্ট্রেলিয়া।
তবে চতুর্থ উইকেটে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন স্টিভেন স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিন। দুজনের ব্যাটে গড়ে ওঠে ৭৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। তখন মনে হচ্ছিল, প্রথম দিনের শেষভাগে ব্যাটিংয়ের জন্য উইকেট হয়তো সহজ হয়ে এসেছে।
কিন্তু শরিফুলের জন্য ম্যাচ তখনও শেষ হয়নি।
নতুন স্পেলে ফিরে এসে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে স্মিথকে ফিরিয়ে দেন তিনি। ইনস্যুইং বলটি অফ স্টাম্পে পড়ে ভেতরের দিকে ঢুকে যাচ্ছিল। শাফল করে সরে গিয়ে বলটি খেলতে গিয়ে পায়ে আঘাত পান স্মিথ। আম্পায়ার ধর্মসেনা প্রথমে আবেদনে সাড়া দিলে রিভিউ নেন স্মিথ। পুনঃপরীক্ষায় দেখা যায়, বলটি অল্পের জন্য স্টাম্পে আঘাত করত।ফলে ফিরে যেতে হয় স্মিথকে।
এরপর মেহেদী হাসান মিরাজের বলে উইকেট ছুড়ে দিয়ে ফেরেন আলেক্স কেয়ারি। অস্ট্রেলিয়ার পঞ্চম উইকেট পতনের পর আবারও দায়িত্ব নেন শরিফুল।এবার তার শিকার বাউ ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্ক। পরপর তিনটি উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার লোয়ার অর্ডারেও ধস নামান তিনি।
দিন শেষে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা শরিফুলের বোলিং। মাত্র ৩৫ রান খরচ করে ৬ উইকেট নিয়েছেন তিনি। এটি তার টেস্ট ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং।একদিকে স্টার্কের ৬ উইকেট বাংলাদেশকে ৬৪ রানে গুটিয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে শরিফুলের ৬ উইকেট অস্ট্রেলিয়াকে বড় লিড নেওয়ার সুযোগ থেকে অনেকটাই দূরে রেখেছে।
অস্ট্রেলিয়া অবশ্য এখনো ১০১ রানে এগিয়ে। কিন্তু ১৬৫ রান তুলতেই ৮ উইকেট হারানোয় তাদের ইনিংসও খুব একটা নিরাপদ অবস্থায় নেই।দিনের শেষ দিকে গ্রিন ও লায়ন ১৭ রানের জুটি গড়ে উইকেটে টিকে আছেন। গ্রিনের ব্যাটে ৫১ রান থাকায় অস্ট্রেলিয়া কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও দ্রুত দুটি উইকেট তুলে নিতে পারলে বাংলাদেশের সামনে ব্যবধান আরও কমিয়ে আনার সুযোগ থাকবে।
প্রথম দিনের হিসাব তাই দুই দলের জন্যই অদ্ভুত। বাংলাদেশের ব্যাটিং ৬৪ রানে শেষ হলেও শরিফুলের অসাধারণ বোলিং ম্যাচের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হতে দেয়নি। অন্যদিকে স্টার্কের বিধ্বংসী শুরু অস্ট্রেলিয়াকে এগিয়ে দিলেও স্বাগতিকদের ইনিংসও এখন আট উইকেট হারিয়ে নড়বড়ে।
ম্যাকাইয়ে এক দিনে ১৮ উইকেটের পতন তাই বলে দিচ্ছে—ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ এখনো পুরোপুরি কোনো এক দলের হাতে যায়নি।

