একজন কিংবদন্তির বিদায়। অথচ সেই বিদায়ের আবেগ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ফুটবল বিশ্বে। কেউ চোখের জলে, কেউ স্মৃতিচারণায়, কেউ ভালোবাসার বার্তায় আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি লিওনেল মেসিকে শেষবারের মতো বিদায় জানাচ্ছেন। বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের বাইরে সমর্থকদের ঢল যেমন দেখা গেছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বর্তমান ও সাবেক সতীর্থদের আবেগঘন বার্তায় ভেসে উঠেছে মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ারের স্মৃতি।
মঙ্গলবার মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচকে ঘিরে মনুমেন্তালের বাইরে জড়ো হন হাজারো সমর্থক। প্রিয় তারকাকে শেষবারের মতো জাতীয় দলের জার্সিতে দেখার আনন্দের সঙ্গে তাদের মধ্যে ছিল বিদায়ের বিষণ্নতাও।
মেসির সাবেক বার্সেলোনা ও প্যারিস সেন্ট জার্মেই সতীর্থ এবং দীর্ঘদিনের বন্ধু নেইমারও বিদায়ী বার্তায় মেসির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। বেনিনের বিপক্ষে মেসির ২০৮তম ও শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে ইনস্টাগ্রামে তিনি লেখেন, শুধু আর্জেন্টিনা নয়, ফুটবলে মেসির অবদানের জন্য গোটা বিশ্বেরই তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
মেসিকে উদ্দেশ করে নেইমার আরও বলেন, মেসিই তাকে ফুটবলকে আরও বেশি ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। তার বিপক্ষে খেলতে পারা যেমন সম্মানের ছিল, তেমনি তার সঙ্গে ইতিহাসের অংশ হতে পারা ছিল আরও বড় পাওয়া।
মেসির ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আর্জেন্টিনা সতীর্থ রদ্রিগো দে পলের বিদায়ী বার্তাতেও ফুটে উঠেছে গভীর আবেগ। ইন্টার মায়ামিতেও মেসির সঙ্গে খেলা দে পল মনে করেন, তার বন্ধুর প্রভাব শুধু ফুটবল মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়।
দে পল বলেন, মেসি তাকে শুধু একজন ফুটবলার হিসেবেই নয়, একজন মানুষ হিসেবেও বেড়ে উঠতে সাহায্য করেছেন। মেসির প্রভাবে তিনি নিজেকে আরও ভালো মানুষ, অ্যাথলেট, বাবা ও বন্ধু হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছেন বলেও জানান তিনি।
মেসির প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়ে দে পল বলেন, ‘আমি তাকে ভালোবাসি। সে জানে, সে আমার ভাইয়ের মতো এবং তার হৃদয়টা বিশাল।’
সাবেক আর্জেন্টিনা সতীর্থ আনহেল দি মারিয়াও মেসির বিদায়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। এমন একটি দিন কেউই দেখতে চাননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, মেসিকে এতটা সুখী দেখা এবং নিজের সবটুকু দিয়ে ক্যারিয়ার শেষ করতে দেখা—এটাই সবার জন্য আনন্দের। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মেসির প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবেন বলেও জানান দি মারিয়া।
এদিকে মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের সাক্ষী হতে মনুমেন্তালে ছুটে এসেছেন হাজারো সমর্থক। তাদেরই একজন ১৯ বছর বয়সী হোসে গারাসেদো। মেসিকে শেষবার জাতীয় দলের জার্সিতে দেখতে পারার আনন্দের পাশাপাশি এরপর থেকে এই মাঠে তাকে আর দেখা যাবে না—এই ভাবনাই তাকে কাঁদিয়েছে।
গারাসেদো বলেন, মেসি আর্জেন্টিনার জার্সির জন্য লড়াই করেছেন এবং তার কাছে যা কিছু চাওয়া হয়েছে, সবকিছুই দিয়েছেন। নিজের পথের প্রতি অটল থেকে কীভাবে লড়াই করতে হয়, কীভাবে ফুটবল উপভোগ করতে হয়—মেসি সেটিও দেখিয়েছেন বলে মনে করেন তিনি।
২৭ বছর বয়সী মেডিকেল শিক্ষার্থী ইসাইয়াস জেনাসের কাছে মেসির গুরুত্ব আরও বিস্তৃত। তার মতে, মেসির অবদান শুধু ফুটবল দিয়ে বিচার করার সুযোগ নেই। অর্থনৈতিক সংকট ও নানা ধরনের সংগ্রামের মধ্যেও ফুটবল আর্জেন্টিনার মানুষের জন্য আশ্রয়ের মতো কাজ করেছে। আর সেই ফুটবলে মেসি দেশকে যে আনন্দ ও সাফল্য এনে দিয়েছেন, তার জন্য বিদায়ী ম্যাচে তাকে শেষবারের মতো দেখতে আসা সমর্থকদের কাছে এক ধরনের দায়বদ্ধতা।
বিশ্বকাপ ও দুটি কোপা আমেরিকা জেতানো মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে বিদায়ী ম্যাচে নামেন জাতীয় দলের হয়ে রেকর্ড ১২৫ গোল ও ৬৮ অ্যাসিস্ট নিয়ে। বিদায়ী ম্যাচে বাংলাদেশ সময় বুধবার সকালে বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে ফিফা প্রীতি ম্যাচে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে আলবিসেলেস্তেরা। দীর্ঘ দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের বিদায়কেও তিনি সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন এক বাক্যে—‘আমি শান্তিতে বিদায় নিচ্ছি। আমি আমার সবটুকু দিয়েছি।’
মেসির সেই ‘সবটুকু দেওয়া’র গল্পই যেন আজ আর্জেন্টিনার সীমানা ছাড়িয়ে পুরো ফুটবল বিশ্বের স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে।

