২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তামাকজাত পণ্যের মূল্য ও কর কাঠামো নিয়ে জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সিগারেটের দাম সামান্য বাড়ানো এবং বিড়ি, জর্দা ও গুলের মতো ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের মূল্য অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারের লক্ষ্য তামাকের ব্যবহার কমিয়ে জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা কিন্তু বাজেট প্রস্তাবনায় সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পরিবর্তে এমন কিছু সিদ্ধান্ত এসেছে, যা তামাকপণ্যের ব্যবহার আরও সহজ করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মে ২০২৬ সালের হিসাবে দেশে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৯.৪২ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে কোনো পণ্যের নামমাত্র দাম অপরিবর্তিত থাকলে বাস্তবে সেই পণ্যের মূল্য কমে যায়। ফলে জর্দা, গুল ও বিড়ির মতো ক্ষতিকর তামাকপণ্য আগের তুলনায় আরও সস্তা ও সহজলভ্য হয়ে উঠবে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন সিদ্ধান্ত তামাক নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে দুর্বল করতে পারে।
গ্লোবাল এডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস ২০১৭)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০.৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করেন। ধোঁয়া না থাকায় অনেকে এসব পণ্যকে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর মনে করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। জর্দা ও গুলে উচ্চমাত্রার নিকোটিন, ক্ষতিকর ভারী ধাতু এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী বিভিন্ন উপাদান রয়েছে। তাই এসব পণ্যের সহজলভ্যতা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশের নারীরা। গ্যাটসের তথ্য অনুযায়ী, পুরুষদের মধ্যে এ ধরনের তামাক ব্যবহারের হার ১৬.২ শতাংশ হলেও নারীদের ক্ষেত্রে তা ২৫.৮ শতাংশ। অর্থাৎ নারীদের মধ্যে এই প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
জর্দা ও গুলের ব্যবহার গর্ভকালীন নানা জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়। গর্ভপাত, মৃত শিশু জন্ম এবং কম ওজনের শিশু জন্ম দেওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। ২০১০-১১ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের পেডিয়াট্রিকস, অবস্টেট্রিকস ও গাইনি বিভাগের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রিম্যাচিওর শিশুর মায়েদের মধ্যে ৪৬ শতাংশ গুল এবং ২১.৭৩ শতাংশ জর্দা ব্যবহার করতেন। গবেষণাটি ২০১৬ সালে বাংলাদেশ চাইল্ড হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
ধোঁয়াবিহীন তামাক নারীদের মুখগহ্বরের ক্যান্সার, জরায়ুর ক্যান্সার ও হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের ও গ্রামীণ নারীদের মধ্যে এসব পণ্যের ব্যবহার বেশি হওয়ায় স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বোঝাও বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয় তাদের পরিবারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে উপেক্ষা করার অর্থ হলো দেশের একটি বড় উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। অথচ এবারের বাজেটে জর্দা ও গুলের দাম অপরিবর্তিত রেখে সেই ঝুঁকিকেই কার্যত গুরুত্বহীন করে দেখা হয়েছে।
শুধু ধোঁয়াবিহীন তামাক নয়, সিগারেটের ক্ষেত্রেও প্রস্তাবিত কর কাঠামোকে অপর্যাপ্ত বলা হচ্ছে। নিম্নস্তরের ১০ শলাকা সিগারেটের দাম ৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা মাত্র ৩.৩ শতাংশ বৃদ্ধি। অথচ মূল্যস্ফীতি ৯.৪২ শতাংশ হওয়ায় প্রকৃত হিসাবে নিম্নস্তরের সিগারেটের মূল্য প্রায় ৫.৬ শতাংশ কমে যাবে। একইভাবে উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটেও প্রকৃত মূল্যবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে থাকবে।
প্রস্তাবিত বাজেটের আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো নতুন প্রজন্মের তামাকপণ্যের জন্য কর নির্ধারণ। বাজেটে প্রতি ১০ গ্রাম নিকোটিন পাউচের মূল্য ৫০০ টাকা, যার ওপর ৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১০ শলাকা হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্টের মূল্য ২১০ টাকা এবং এর ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রস্তাব করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, কর নির্ধারণের মাধ্যমে এসব পণ্যের বাজারজাতকরণ কার্যত বৈধতা পাচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্ট নিষিদ্ধ বা কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার দাবি জোরালো হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে এগুলোর জন্য কর কাঠামো নির্ধারণ নতুন বাজার তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পণ্য মূলত তরুণ ও কিশোরদের লক্ষ্য করেই বাজারজাত করা হয় এবং আকর্ষণীয় প্রচারণার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে আসক্ত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জর্দা ও গুলের খুচরা মূল্য দ্রুত বাড়াতে হবে এবং এর ওপর নির্দিষ্ট কর আরোপ করতে হবে, যাতে এসব পণ্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। পাশাপাশি সিগারেটের চার স্তরের জটিল কর ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করে নিম্ন ও মধ্যম স্তরকে একীভূত করার সুপারিশ করা হয়েছে। সব স্তরেই মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যকর মূল্যবৃদ্ধি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্টের ওপর কর আরোপের পরিবর্তে সেগুলো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তামাকজাত পণ্যের ক্ষতি কেবল একজন ব্যবহারকারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পরিবার, জাতীয় অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও পড়ে। তামাকজনিত রোগের চিকিৎসায় প্রতিবছর যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, তামাক খাত থেকে সরকারের অর্জিত রাজস্ব তার তুলনায় কম বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।
বিশেষ করে ধোঁয়াবিহীন তামাকের সহজলভ্যতা দেশের নারী ও গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, তা বাস্তবায়ন করতে হলে বর্তমান বাজেট প্রস্তাবনায় তামাকসংক্রান্ত বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করার দাবি উঠেছে। জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে করপোরেট স্বার্থের পরিবর্তে জনগণের কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে একটি সুস্থ ও তামাকমুক্ত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই এখন সময়ের অন্যতম বড় প্রয়োজন।

