দেশে বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চলতি বছরের জুলাই মাসের প্রথম ১৫ দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ২৬৬ জন, যা শুধু চলতি মাস নয়, ২০২৬ সালের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ মাসিক সংক্রমণের রেকর্ড। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩৯১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন দুইজন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থেমে থেমে বৃষ্টি, জমে থাকা পানি এবং মশক নিয়ন্ত্রণে ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৩৯১ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সময় ডেঙ্গুতে ঢাকা বিভাগে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন পাঁচ বছর বয়সী কন্যাশিশু এবং অন্যজন ৪৬ থেকে ৫০ বছর বয়সী একজন পুরুষ।
এর ফলে চলতি জুলাই মাসে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ জনে। এর আগে জুন মাসে ডেঙ্গুতে ১৩ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ৯ হাজার ৩৭০ জন।
মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ভর্তি হন ১ হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯ জন, মার্চে ৩৫৩ জন, এপ্রিলে ৬৪০ জন, মে মাসে ৭১৪ জন এবং জুনে ২ হাজার ৯০৭ জন। আর জুলাই মাসের প্রথম ১৫ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ২৬৬ জনে পৌঁছেছে, যা জুনের পুরো মাসের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
মৃত্যুর পরিসংখ্যানেও একই ধরনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। জানুয়ারিতে দুইজন, ফেব্রুয়ারিতে দুইজন এবং মে মাসে একজনের মৃত্যু হয়। মার্চ ও এপ্রিলে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তবে জুন থেকে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি শুরু হয়। জুনে ১৩ জন এবং জুলাইয়ের প্রথম ১৫ দিনেই আরও ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার প্রজনন বেড়ে গেছে। পাশাপাশি মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে দুর্বলতা এবং প্রজননস্থল ধ্বংসে পর্যাপ্ত উদ্যোগ না থাকায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সালের মতে, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় প্রশাসনের মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও কার্যকর না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তিনি বলেন, শুধু ওষুধ ছিটানো নয়, এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ধ্বংস করা, নিয়মিত লার্ভিসাইড ব্যবহার এবং সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতাও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাড়ির আঙিনা, ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা যেকোনো পাত্রে যাতে তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

