দেশে হামের প্রকোপ শুরু হওয়ার প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা এবং মৃত্যুহার কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না। এর ফলে সরকারের টিকাদান কর্মসূচি আদৌ কতটা কার্যকরভাবে শিশুদের সুরক্ষা দিতে পারছে, সেই প্রশ্ন এখন জোরালোভাবে সামনে চলে এসেছে।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার শিশু হাম বা হামজনিত উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, আর গড়ে চার থেকে ছয়জন শিশুর মৃত্যু হচ্ছে প্রতিদিনই। গত ছয় মাসে এমন একটি দিনও যায়নি, যেদিন এই রোগে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি। কেবল গত এক দিনেই নতুন করে চারজন শিশু মারা গেছে, ফলে মোট মৃতের সংখ্যা এখন সাড়ে আটশ ছাড়িয়ে গেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ বলছেন, টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণেই মৌলিক ভুল হয়েছিল, যার ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু এখনো টিকার আওতার বাইরে রয়ে গেছে। তাঁদের মতে, দ্রুত এসব শিশুকে টিকার আওতায় আনার পাশাপাশি যাদের আগে টিকা দেওয়া হয়েছে তাদের শরীরে পর্যাপ্ত প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না, তাও যাচাই করা জরুরি। একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, সরকার এখন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে যেসব শিশু টিকা পায়নি তাদের চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে টিকাদানের চেষ্টা করছে। সার্বিক টিকা কভারেজ ৯৫ শতাংশে পৌঁছালে সংক্রমণের হার নিচে নামতে পারে বলে তাঁর ধারণা, তবে এ জন্য আরও কিছু সময় প্রয়োজন। তিনি আরও মনে করেন, শুধু টিকাদানেই সমাধান আসবে না—চিকিৎসাসেবা তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে না দিলে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমবে না।
চলতি বছরের মার্চ মাসে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর এপ্রিলের শুরু থেকে সরকার ধাপে ধাপে একটি টিকাদান কর্মসূচি চালু করে, যার লক্ষ্য ছিল ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী প্রায় এক কোটি আশি লাখের বেশি শিশু। সরকারি হিসাবে এই কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি অর্জন হয়েছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পরিচালিত ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচির আওতায় আসা শিশুর সংখ্যার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, প্রায় ছেচল্লিশ লাখ শিশু হামের টিকার বাইরে থেকে গেছে।
একজন ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞ জানান, কাগজে-কলমে শতভাগ কভারেজের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্রে তা মাত্র একাশি শতাংশের মতো। পঁচানব্বই শতাংশ শিশু টিকার আওতায় না আসায় সংক্রমণ কমছে না বলেই মৃত্যুও থামছে না বলে তাঁর বিশ্লেষণ। তিনি এমনও উল্লেখ করেছেন যে পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের মধ্যেও হাম শনাক্ত হচ্ছে, তাই বয়সসীমা বাড়িয়ে দশ থেকে পনেরো বছর পর্যন্ত শিশুদের টিকার আওতায় আনার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি টিকা নেওয়ার পরও শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না তা যাচাই করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা একজন মন্ত্রী জানিয়েছেন, ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচি চালানোর পরই সরকার বুঝতে পারে যে হামের টিকাদানে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ভুল হয়েছিল। মে মাসের শেষ দিকে জাতীয় পর্যায়ের হাম টিকাদান কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলেও এর পরদিন থেকেই স্বাস্থ্যকর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে টিকা দেওয়া অব্যাহত রেখেছেন।
এদিকে টিকা প্রকৃতপক্ষে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা যাচাইয়ের জন্য একটি জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক জানিয়েছেন, টিকা নেওয়া শিশুদের শরীরে সুরক্ষামূলক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না তা যাচাইয়ের জন্য নমুনা সংগ্রহের প্রস্তুতি চলছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত পরীক্ষার কিট বিদেশ থেকে আনা হচ্ছে, যা চলতি মাসের মাঝামাঝি হাতে পাওয়ার পর পরীক্ষা শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে শহরাঞ্চলের একটি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে শুরু করে পরে গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকেও নমুনা সংগ্রহ করা হবে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় পাঁচ থেকে ছয় শতাধিক শিশুর নমুনা পরীক্ষার কথা ভাবা হচ্ছে, যদিও চূড়ান্ত সংখ্যা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
অন্যদিকে হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। রাজধানীর একটি নির্ধারিত হাসপাতালের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, রোগীর চাপ সামান্য কমলেও পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে আছে। বর্তমানে সেখানে গড়ে তিনশ থেকে সাড়ে তিনশর মতো রোগী ভর্তি থাকছেন, আর প্রতিদিন নতুন করে যোগ হচ্ছে গড়ে ৮০ থেকে ১০০ জন—যা আগে ছিল ১২০ থেকে ১৩০ জনের মতো। নিবিড় পরিচর্যা বিভাগেও প্রতিনিয়ত পঞ্চাশের কাছাকাছি রোগী চিকিৎসাধীন থাকছেন।
এই ক্রমাগত রোগীর চাপ চিকিৎসাব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীকরণ করার প্রয়োজনীয়তাকেও নতুন করে সামনে এনেছে। সম্প্রতি দেশের একটি জেলা শহরে আইসিইউ শয্যা না পাওয়ায় আট মাস বয়সী এক হাম আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর ঘটনা এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগী সংকটাপন্ন হয়ে পড়ার আগেই যদি স্থানীয় পর্যায়ে যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এ ধরনের অনেক মৃত্যু এড়ানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য বিভাগের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হাম সন্দেহে সোয়া লাখের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই—প্রায় সোয়া লাখ—সুস্থ হয়ে ফিরেছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, টিকাদানের প্রকৃত আওতা যথাযথভাবে না বাড়ানো গেলে এবং চিকিৎসাসেবা বিকেন্দ্রীকরণ না হলে আগামী দিনেও এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

