দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। সংক্রমণ ও মৃত্যু—দুই ক্ষেত্রেই এগিয়ে আছে এই বিভাগ। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ছয় হাজার আটশ একাত্তর জন, যার মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই আক্রান্তের সংখ্যা চার হাজার চারশ চার জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘনবসতি, সারা বছর ধরে এডিস মশার প্রজনন এবং মশা নিয়ন্ত্রণে ঘাটতির কারণেই ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁরা দেশজুড়ে একটি সমন্বিত ও কেন্দ্রীয় মশা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সবশেষ তথ্য বলছে, সংক্রমণের বিচারে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বরিশাল বিভাগ, যেখানে আক্রান্ত হয়েছেন তিন হাজার ছয়শ সাতচল্লিশ জন। এরপর চট্টগ্রামে তিন হাজার বিরাশি এবং খুলনায় দুই হাজার দুইশ বাহাত্তর জন আক্রান্তের তথ্য পাওয়া গেছে।
মৃত্যুর হিসাবেও শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ছাব্বিশ জন, তার মধ্যে পঁচিশ জনই ঢাকা শহরের বাসিন্দা। এরপরই রয়েছে খুলনা বিভাগ, যেখানে মৃত্যু হয়েছে বারো জনের। চট্টগ্রামে সাত এবং ময়মনসিংহে ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
সব মিলিয়ে চলতি বছরের এখন পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুতে প্রাণ গেছে ঊনষাট জনের, আর আক্রান্তের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সতেরো হাজার আটশ আশি জনে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হালনাগাদ করা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই তথ্য জানা গেছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক বলেন, ঢাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব, সারা বছর এডিস মশার বংশবিস্তার এবং মশা নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা—এই তিন কারণ একসঙ্গে মিলেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে তুলছে। তাঁর ভাষ্যে, ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ, উষ্ণ জলবায়ু এবং মশার প্রজননের অনুকূল স্থান থাকায় ঢাকা মূলত এডিস মশা ও ডেঙ্গু ভাইরাসের সারা বছর বিস্তারের জন্য এক ধরনের আদর্শ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এ কারণেই শহরটি পরিণত হয়েছে ডেঙ্গুর অন্যতম প্রধান কেন্দ্রস্থলে।
তিনি জানান, কিছুদিন আগে রাজধানীর একটি মহিলা কলেজে পরীক্ষা তদারকির সময় তিনি নিজেই পানিভর্তি একটি ছোট পাত্রে এডিস মশার লার্ভা দেখতে পান। তাঁর মতে, শহরের বিভিন্ন প্রান্তে এমন অসংখ্য সম্ভাব্য প্রজননস্থল ছড়িয়ে আছে, যা প্রমাণ করে আবাসিক এলাকাগুলোতেও মশার বংশবিস্তার থেমে নেই।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম মূলত প্রতিক্রিয়াশীল, অর্থাৎ পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পরই ব্যবস্থা নেওয়া হয়, প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। তাঁর পরামর্শ, ডেঙ্গুর সংক্রমণ যখন তুলনামূলক কম থাকে, তখনই মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে, কারণ সে সময় প্রজননস্থলও কম থাকে এবং নেওয়া পদক্ষেপ বেশি ফলপ্রসূ হয়। কিন্তু বাস্তবে সাধারণত মৌসুম শুরুর পরই কার্যক্রম বাড়ানো হয়, ততদিনে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া শুরু হয়ে যায়।
তাঁর মতে, বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ও পরিকল্পিত মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অনুপস্থিতিও ডেঙ্গু বাড়ার একটি বড় কারণ। যেসব দেশে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনায় মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়, সেখানে সাধারণত ভালো ফল পাওয়া যায়। বিপরীতে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন শহরে ভিন্ন ভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলে কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব দেখা দেয় এবং ফলাফলও জায়গাভেদে ভিন্ন হয়। এ কারণে তিনি বিশেষজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় মশা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব দেন, যারা সারা দেশের কার্যক্রম তদারকি ও নজরদারি করবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এমন সমন্বিত জাতীয় ব্যবস্থা গড়ে না উঠলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একজন অধ্যাপকও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা, আগস্ট মাসজুড়ে ডেঙ্গু সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে এবং এই প্রবণতা সেপ্টেম্বরেও অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যায়, আগস্টে সংক্রমণ হয়তো সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে না, বরং এ বছর সংক্রমণের শীর্ষবিন্দু সেপ্টেম্বরেও দেখা যেতে পারে। তবে সার্বিকভাবে আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংক্রমণ বাড়ার ধারা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি বলে তিনি মনে করেন।
এই কীটতত্ত্ববিদের মতে, সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং উৎসস্থল সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করা। যেসব প্রজননস্থল সম্পূর্ণ অপসারণ বা ধ্বংস করা সম্ভব নয়, সেখানে দীর্ঘস্থায়ী কার্যকারিতাসম্পন্ন কীটনাশক বা মশার বংশবৃদ্ধি রোধকারী উপাদান প্রয়োগের পরামর্শ দেন তিনি।
পাশাপাশি তিনি মশা নিয়ন্ত্রণ ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও সক্রিয় সম্পৃক্ততার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, ওয়ার্ড পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলোকে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে আরও সরাসরি ও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট, শুধু মৌসুমভিত্তিক তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি, পরিকল্পিত ও কেন্দ্রীয় মশা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাই পারে ডেঙ্গুর ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি থেকে দেশকে সুরক্ষিত রাখতে।

