স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়িয়ে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করছে। তবে এই প্রযুক্তির সুফল দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে অবকাঠামো, সুশাসন, তথ্যের মান এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ঘাটতি দূর করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ২০২৬ সালের বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার এমন চিত্র উঠে এসেছে।
৬ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিপুল অর্থ ব্যয়ে অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল তৈরি করার পরিবর্তে বিদ্যমান প্রযুক্তিকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ ও ব্যবহার করেও উন্নয়নশীল দেশগুলো বড় ধরনের সুফল পেতে পারে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তারই একটি দৃষ্টান্ত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গত তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, উন্নত ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল দক্ষতা এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় এরই মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাস্তব সুফল দিতে শুরু করেছে। ডায়াবেটিসের কারণে চোখের রেটিনায় ক্ষতি শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর চিকিৎসা-চিত্র বিশ্লেষণ ব্যবস্থার ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারকারী চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো প্রতিদিন রোগী পরীক্ষার সক্ষমতা সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পেরেছে। ফলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও চক্ষুরোগ শনাক্তকরণে দক্ষ চিকিৎসকের ঘাটতি মোকাবিলায় প্রযুক্তিটি সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এখানেই। অর্থাৎ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সেবার আওতা বাড়ানো এবং মানুষের কাজের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা। এতে প্রযুক্তি চিকিৎসকদের প্রতিস্থাপন না করে বরং তাদের কাজকে আরও কার্যকর করতে সহায়তা করছে।
তবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। দরিদ্র পরিবার শনাক্ত করতে মুঠোফোনের তথ্য ব্যবহার করে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যোগ্য পরিবারগুলোর মাত্র ৩২ শতাংশকে সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছে ব্যবহৃত প্রযুক্তি। অর্থাৎ ৬৮ শতাংশ যোগ্য পরিবারই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে গেছে। পাশাপাশি প্রায় ৬ শতাংশ পরিবারের সঙ্গে কোনো মুঠোফোনের তথ্যই মেলানো সম্ভব হয়নি। ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কিছু পরিবার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর এই শনাক্তকরণ ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও পুরোপুরি তৈরি হয়নি। জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের মাত্র ৪৫ শতাংশ মনে করেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সুবিধাভোগী নির্বাচন করার পদ্ধতিটি ন্যায্য। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, প্রযুক্তি কাজের গতি ও দক্ষতা বাড়াতে পারলেও তথ্যের মান খারাপ হলে কিংবা ব্যবস্থার নকশায় দুর্বলতা থাকলে তা বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের পাশাপাশি যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারকে আরও দায়িত্বশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার উদ্যোগও এগোচ্ছে। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের জন্য একটি জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি প্রণয়নের প্রস্তুতি চলছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে প্রযুক্তিটির দায়িত্বশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করা।
প্রস্তাবিত নীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা তদারকির জন্য একটি জাতীয় তথ্য সুশাসন কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলা হয়েছে। গত এক দশকে সরকারি ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সরকারের উদ্ভাবনী উদ্যোগও এই নীতির ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুশাসন নিয়ে পরামর্শ দিতে শিক্ষাবিদ, শিল্পখাত ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি বহুপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাপনায় এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বিশ্বের প্রথম আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চুক্তি হিসেবে পরিচিত ইউরোপীয় কাউন্সিলের কাঠামোগত সনদ অনুমোদনের দিকেও দেশটি এগোচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে বেশ কিছু কাঠামোগত বাধা রয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাপড় কাটা ও সেলাইয়ের প্রযুক্তি বহু বছর ধরেই বাজারে থাকলেও তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়ের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান এসব প্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহী নয়। এর পাশাপাশি জটিল বিধিবিধান এবং নিয়ম মেনে চলার ব্যয়ও উন্নত প্রযুক্তি গ্রহণের পথে বাধা তৈরি করছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি, সীমিত ডিজিটাল অবকাঠামো, দক্ষ জনবলের অভাব এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দূরবর্তী এলাকায় দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা বাড়াতে বাংলাদেশ উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারীদের জন্য বাজার উন্মুক্ত করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সংযোগ বাড়ালেই হবে না; স্থানীয় তথ্য অবকাঠামো, গণনাক্ষমতা এবং ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধিতেও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য বড় সম্ভাবনা হিসেবেও দেখা হয়েছে। প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ১৬.২ শতাংশ কর্মসংস্থানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা ১৮.৭ শতাংশ।
অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মাত্র ৪.৫ শতাংশ কর্মসংস্থান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই হার ১৪.২ শতাংশ। অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়ার চেয়ে কর্মীদের কাজের সক্ষমতা বাড়াতে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীর প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দারমিত গিল বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে এবং তাদের সেটি কাজে লাগানো উচিত। তার মতে, এই প্রযুক্তির সুবিধা নিতে প্রতিটি দেশের বিপুল তথ্যকেন্দ্র বা অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল তৈরির প্রয়োজন নেই। বরং অবকাঠামো, দক্ষতা ও সুশাসন শক্তিশালী করার কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুই দিকই সামনে আনছে। স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার যেখানে কম সময়ে বেশি মানুষকে সেবা দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে, সেখানে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে দুর্বল তথ্য ও ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা মানুষের একটি বড় অংশকে সুবিধার বাইরে ঠেলে দিতে পারে। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না; এর সুফল সবার কাছে পৌঁছাতে প্রয়োজন হবে নির্ভরযোগ্য তথ্য, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর তদারকি এবং মানুষের আস্থা।

