দেশের ৬৪টি জেলাতেই এখন ডেঙ্গুর সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে, আর এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী মিলছে দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলায়। তবে কেন সেখানে সংক্রমণ এত বেশি বাড়ছে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো স্পষ্ট করতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক এক রোগতাত্ত্বিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত এক সপ্তাহে দেশের ছয়টি জেলায় ডেঙ্গু সংক্রমণ চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। এই তালিকায় রয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি জেলা, পার্বত্য একটি জেলা এবং রাজধানীসহ একটি বিভাগীয় শহর।
স্বাস্থ্য বিভাগের জরুরি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত ওই দক্ষিণের জেলায় প্রায় ১ হাজার ১৫৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৭৬ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত বছর একই সময়ে এই জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৭৭ জন—অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সংক্রমণ প্রায় আড়াই গুণেরও বেশি বেড়েছে।
উত্তরাঞ্চলের একটি বিভাগীয় শহরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শয্যা–সংকট এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে রোগীদের মেঝেতে শুইয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক এই চিত্র দেশের হাসপাতালব্যবস্থার ওপর ডেঙ্গুর চাপ কতটা বেড়েছে, তারই একটি প্রতিফলন।
সর্বশেষ চব্বিশ ঘণ্টার হিসাবে সারা দেশে নতুন করে ৮০৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মোট হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রায় ২৪ হাজার জন, যাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৭০ জনের। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন প্রায় ১ হাজার ৭৫০ জন রোগী।
সবসময়ের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায়—প্রায় সাড়ে নয় হাজার জন। এরপরের অবস্থানে আছে দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি বিভাগ, যেখানে ভর্তি হয়েছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার রোগী। এরপর পর্যায়ক্রমে রয়েছে বন্দরনগরী–কেন্দ্রিক বিভাগ, দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলীয় বিভাগ, উত্তরাঞ্চলের দুটি বিভাগ। সবচেয়ে কম সংক্রমণ দেখা গেছে দেশের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় একটি বিভাগে, যেখানে রোগীর সংখ্যা মাত্র ১৩৩ জন।
কীটতত্ত্ববিদেরা আগে থেকেই সতর্ক করেছিলেন যে বছরের এই সময়টাতে অর্থাৎ শ্রাবণ–ভাদ্র মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি বাড়ে। পরিসংখ্যান বলছে, বছরের শুরুর দিকে রোগীর সংখ্যা কম থাকলেও গ্রীষ্মের শেষভাগ থেকে তা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে। চলতি মাসের প্রথম ষোলো দিনেই সারা দেশে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সাড়ে আট হাজারের বেশি রোগী, যা এ বছরের অন্য যেকোনো মাসের চেয়ে বেশি।
তবে আশার কথা হলো, সামগ্রিক পরিসংখ্যানে এবার গত বছরের তুলনায় সংক্রমণ কিছুটা কম। গত বছর একই সময়ে দেশজুড়ে প্রায় ২৬ হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং মৃত্যু হয়েছিল ১০৪ জনের।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছর দক্ষিণাঞ্চলের আরেকটি জেলায় ভয়াবহ আকারে ডেঙ্গু ছড়িয়েছিল, যেখানে প্রায় সাড়ে নয় হাজার মানুষ আক্রান্ত হন এবং মারা যান পনেরো জন। সেই অভিজ্ঞতার পর স্থানীয় প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনগুলো ব্যাপক মশা নিধন কার্যক্রম চালানোয় এবার সেই জেলায় সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণের নিচু ও জলাবদ্ধ এলাকাগুলোতে ডেঙ্গুর ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। এসব এলাকায় দীর্ঘদিন পানি জমে থাকা এবং মানুষের বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের অভ্যাস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। যে জেলায় গত বছর কার্যকর উদ্যোগের ফলে পরিস্থিতি সামলানো গিয়েছিল, প্রায় একই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিবেশী জেলায় এবার তেমন সচেতনতামূলক কার্যক্রম না থাকায় সংক্রমণ ক্রমেই বাড়ছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
দেশের সংক্রামক রোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানান, স্থানীয় পর্যায়ে সময়মতো মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নেওয়া হলে সংক্রমণের গতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তাঁর মতে, একটি জেলায় সফল উদ্যোগের অভিজ্ঞতা অন্য জেলাগুলোতেও প্রয়োগ করা প্রয়োজন। নইলে প্রতিবছরই কোনো না কোনো নতুন জেলায় ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
সব মিলিয়ে চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আসন্ন সপ্তাহগুলোতে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখনই সারা দেশে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি মশা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করা গেলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নিতে পারে বলে সতর্ক করছেন তাঁরা।

